আমাদের সবার বাসায় কলিংবেল আছে। কলিংবেল না থাকলেও কড়া আছে। যখন কেউ ঘরে আসতে চায় তখন বাইরে থেকে কলিংবেল অথবা কড়া নাড়ে। ঘরের মানুষ বুঝতে পারে বাইরে কেউ আছে। দরজা খুলতে হবে। দরজা খোলার ক্ষেত্রে দুই ধরনের আচরণ দেখা যায়। কড়া নাড়া ব্যক্তি যদি পরিচিত হয় তাহলে আগ্রহ নিয়ে দরজা খোলা হয়। আর যদি অপরিচিত বা কিংবা ভিক্ষুক টাইপের কেউ হয়, তাহলে নিতান্ত অনিচ্ছায় গৃহকর্তা দরজা খোলেন, কখনো কখনো খোলেন না।
দরজা খোলার বিষয়টি সবচেয়ে ভালো বুঝবেন যাদের বাসায় ছোট ছোট বাচ্চা আছে তারা। শিশুটি সারা দিন খেলাধুলায় থাকলেও তার কান থাকে দরজার দিকে। দরজায় নক করলেই সে আনন্দে লাফিয়ে ওঠে। দৌড়ে দরজা খোলার জন্য অস্থির হয়ে যায়। তবে সব ধরনের কলিংবেলের ক্ষেত্রে এমন হয় না। শিশু হলেও সে ঠিক বুঝতে পারে কোনটা তার বাবার বাজানো কলিংবেল। এটা বোঝার ক্ষেত্রে সাধারণত সে টাইমের সহায়তা নেয়। বাবারা সাধারণত একটা টাইম মেনটেইন করে ঘরে ফেরেন। ওই সময়ে কলিংবেল বাজলে শিশুর ভিতর এক ধরনের চাঞ্চল্য তৈরি হয়। মা দরজার কাছে যাওয়ার আগে নিজে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। দরজা খুলতে না পারলেও চেষ্টা করে হাতলটা ধরার। ছিটকিনিটা ছোঁয়ার।
প্রিয় পাঠক! একটি বছর ঘুরে আবার আমাদের দুয়ারে কড়া নাড়ছে মহিমান্বিত রমজান। সময় নামক দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে মাসটি। যাদের দিলের কান সজাগ তারা আরও ছয় মাস আগে থেকেই রমজানের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। রজব মাসের চাঁদ দেখার পরপর তারা রমজানের আবহের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছেন। শাবানের দিন আর রাতগুলোতে তারা যেন রমজানেই ঢুকে পড়েছেন। ফলে রমজান যখন তাদের দুয়ারে কড়া নাড়বে, সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে রমজানকে স্বাগত জানাবে ইবাদত, ইখলাস আর দানখয়রাতের মাধ্যমে। এ হলো আল্লাহর অলিদের রমজান প্রস্তুতির কথা। আমরা যারা গুনাহের ভিতরে ডুবে আছি, আমরা কি রমজানের কড়া নাড়া শুনতে পাচ্ছি? রমজানকে বরণ করে নিতে আমরা কি প্রস্তুত হয়েছি? আমরা শিশুর মতো আনন্দের সঙ্গে রমজানকে বরণ করে নিতে দৌড়ে এগিয়ে গিয়েছি? নাকি আমাদের আচরণ অনাগ্রহে ভরপুর। দরজায় কড়া বেজেই চলছে আর আমরা কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছি। কিংবা উচ্চ শব্দে টিভি ছেড়ে ড্রয়িংরুমে গা এলিয়ে দিয়েছি? কিংবা ভিক্ষুক এসেছে ভেবে দরজার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছি না? একসময় ভিক্ষুক যেমন কড়া নাড়তে নাড়তে হতাশ হয়ে ফিরে যায়, সৌভাগ্যের রমজানও এক মাস কড়া নেড়ে নেড়ে আমাদের দিলের ঘর থেকে ফিরে যাবে। আমাদের দিলের ঘর আগে যেমন অন্ধকার থাকে, রমজান চলে গেলে অন্ধকার আরও বেড়ে যায় এ কারণেই।
বলছিলাম, যাদের দিলের কান খোলা, তারা রমজানের জন্য ছয় মাস আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে থাকেন জোরেশোরে। একদিক থেকে আমরাও ছয় মাস আগে থেকেই রমজানের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে থাকি। সে প্রস্তুতি হলো গুনাহের প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি। রমজানের এক মাসে রোজাদার বান্দাকে কে কত বেশি ঠকাতে পারব সে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় রমজানের অন্তত ছয় মাস থেকে। জাতীয় দৈনিকগুলো আরও ছয় মাস আগে থেকেই এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন খবর প্রকাশ করে। খবরে বলা হয়, রোজায় দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়ানোর ব্যাপারে প্রশাসনের কড়াকড়ি থাকায় এ বছর ছয় মাস আগে থেকেই শুরু হয় দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া। এভাবে কয়েক দফায় দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়ানো হয়। শুধু কি তাই? অনেক ব্যবসায়ী ভেজাল খাবার, পচা ছোলা, বুট, বেসন, মাছ, মাংস, সবজি ফল এগুলো সংরক্ষণ করে রেখেছে রমজানে বিক্রি করবে এই আশায়। রমজানে ইফতারি বা সেহরিতে এসব পচা ভেজালপণ্য চালিয়ে দেওয়া খুব সহজ হয় তাই তাদের এই প্রস্তুতি।
হায়! পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রমজানকে নেওয়া হয় আল্লাহকে রাজি খুশি করানোর সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে। আর আমরা রমজানকে নিয়ে থাকি শয়তানকে খুশি করার মিশন হিসেবে। আমরা যেভাবে অশ্লীলতা, বেহায়াপনা আর মজুতদারি ভেজাল কারবারি করে থাকি, শয়তান আল্লাহর কাছে শোকরিয়া জানায় আমাদের কর্মকাণ্ড দেখে। শয়তান বলে, হে আল্লাহ! রমজানে আমাকে বন্দি রাখলেও আমার শাগরেদ মুরিদরা ঠিকই শয়তানিতে আমাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এক আল্লাহওয়ালা বলেছিলেন, আমাদের চুরিবাটপারি আর মানুষ ঠকানো দেখে শয়তান নিজেও অবাক হয়ে ভাবে, হায়! আমার মাথায় তো এত বুদ্ধি নেই যত বুদ্ধি বাংলাদেশের অসাধু মুসলমানদের মাথায় আছে।
আমরা দোষের সমুদ্রে ডুবে নিজেদের নির্দোষ দাবি করে চলেছি। আসলে এ লেখা কেবল এক সতর্কবার্তা। আমরা যে লোভের আগুন নিয়ে খেলা করছি, মৃত্যুর পর সে লোভই জাহান্নাম হয়ে আমাদের অন্তকাল পোড়াবে-শুধু এতটুকু স্মরণ করিয়ে দেওয়া। আসুন! এখনই সময় নিজেকে শোধরে নেওয়ার। আল্লাহ ওয়ালা হওয়ার। মাটির কবরকে ফুলের বাগান বানানোই হোক এবারের রমজানের টার্গেট।
লেখক : প্রিন্সিপাল, সেইফ এডুকেশন ইনস্টিটিউট