খুলনায় একটি বেকারির কর্মচারীদের পিকনিকে রান্না করা গরুর মাংস হঠাৎ সবুজ হয়ে যাওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে কৌতূহল ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ঘিরে কেউ বিষক্রিয়া, কেউ ভেজাল বা রাসায়নিক ব্যবহারের আশঙ্কা প্রকাশ করলেও মাংসবিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) এনিম্যাল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ মিট সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ড. মো. আবুল হাশেমের মতে, মাংসের ভেতরে আগে থেকেই শুরু হওয়া জটিল রাসায়নিক পরিবর্তনের কারণেই এমন অস্বাভাবিক সবুজ রঙ দেখা দিতে পারে। বাইরে থেকে কোনো রং বা রাসায়নিক মেশানোর প্রয়োজন হয় না।
বুধবার দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, জবাইয়ের পর মাংসের রঙ স্বাভাবিকভাবে কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করে। শুরুতে বেগুনি-লাল, পরে অক্সিজেনের সংস্পর্শে উজ্জ্বল লাল এবং সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে বাদামি রঙ ধারণ করে। তবে সংরক্ষণে সামান্য ত্রুটিও এ স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে অস্বাভাবিক করে তুলতে পারে।
ড. হাশেম জানান, যথাযথ তাপমাত্রা বজায় না থাকলে বা দীর্ঘ সময় অনুপযুক্ত পরিবেশে সংরক্ষণ করলে কিছু ব্যাকটেরিয়া সক্রিয় হয়ে হাইড্রোজেন সালফাইড (H₂S) উৎপন্ন করে। এই যৌগ মাংসের হিম রঞ্জকের সঙ্গে বিক্রিয়া করে সালফমায়োগ্লোবিন (Sulfmyoglobin) তৈরি করে, যার ফলে মাংস সবুজ হয়ে যায়। রান্নার পর এ সবুজ বর্ণ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তিনি বলেন, আরেকটি সম্ভাব্য কারণ হলো কোলেগ্লোবিন (Choleglobin) বা ভার্ডোহিম (Verdoheme) জাতীয় সবুজ রঞ্জকের সৃষ্টি। দীর্ঘদিন সংরক্ষণ, চর্বির জারণ (লিপিড অক্সিডেশন) অথবা কিছু ব্যাকটেরিয়ার উৎপন্ন পারঅক্সাইডের প্রভাবে এ পরিবর্তন ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে এ অবস্থায় মাংসে বাসি তেলের মতো দুর্গন্ধও সৃষ্টি হয়।
অধ্যাপক হাশেম আরও বলেন, প্রক্রিয়াজাত বা কিউরড মাংসে অতিরিক্ত নাইট্রাইট ব্যবহারের ফলেও সবুজ রঙ দেখা দিতে পারে, যা আন্তর্জাতিকভাবে ‘নাইট্রাইট বার্ন’ (Nitrite Burn) নামে পরিচিত। আবার তীব্র জারণের শেষ পর্যায়ে হিম রঞ্জক ভেঙে গিয়ে স্থায়ী সবুজ বর্ণও তৈরি হতে পারে।
খুলনার ঘটনায় কী ঘটতে পারে?
খুলনার ঘটনায় প্রথম দুটি কারণই সবচেয়ে সম্ভাব্য বলে মনে করছেন ড. হাশেম। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গরু জবাইয়ের পর একদিন সাধারণ রেফ্রিজারেটরে রাখা হয়েছিল। এ সময় কোল্ড চেইন সঠিকভাবে বজায় না থাকলে মাংসের ভেতরে ব্যাকটেরিয়ার কার্যক্রম ও রাসায়নিক পরিবর্তন শুরু হতে পারে। পরে রান্না জীবাণু ধ্বংস করলেও সেই পরিবর্তনের চিহ্ন থেকে যায় এবং সবুজ রঙ স্পষ্টভাবে দেখা দেয়।
তার মতে, তরকারির ঝোল স্বাভাবিক লাল থাকলেও শুধু মাংসের টুকরো সবুজ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি ইঙ্গিত করে যে সমস্যাটি বাইরের কোনো মসলা বা রাসায়নিকের নয়; বরং মাংসের অভ্যন্তরীণ হিম রঞ্জকের পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
ড. হাশেম বলেন, এ ধরনের সবুজ বর্ণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনুপযুক্ত সংরক্ষণ বা পচনশীল অবস্থার ইঙ্গিত দেয়। তাই এমন মাংস খাওয়ার ঝুঁকি নেওয়া উচিত নয়। উৎস ও কারণ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সন্দেহজনক রঙের মাংস পরিত্যাগ করাই নিরাপদ।
তিনি আরও বলেন, জবাই থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত পুরো কোল্ড চেইন ঠিকভাবে বজায় রাখা, দ্রুত শীতলীকরণ, স্বাস্থ্যসম্মত সংরক্ষণ এবং মানসম্মত প্যাকেজিং নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের ঘটনা সহজেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
অধ্যাপক হাশেমের মতে, বাংলাদেশে কোল্ড চেইন ব্যবস্থার দুর্বলতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। বিদ্যুৎ বিভ্রাট, পরিবহনের সময় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা কিংবা খুচরা পর্যায়ের অব্যবস্থাপনার কারণে বাইরে থেকে মাংস স্বাভাবিক দেখালেও ভেতরে নীরবে রাসায়নিক পরিবর্তন শুরু হতে পারে, যার প্রকৃত চিত্র অনেক সময় রান্নার পরই প্রকাশ পায়।