জারিফ ইবতিশাম
প্রতিদিন সকালে যখন কাঁধে ব্যাগটা ঝুলিয়ে সিরাজগঞ্জ কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা হই, তখন রাস্তার মোড়ের সেই ধোঁয়া ওঠা চায়ের দোকান কিংবা যমুনার পাড়ের ইটভাটার দিকে চোখ মেলেই বুকটা কেঁপে ওঠে। আমারই বয়সী, কিংবা আমার চেয়েও কয়েক বছরের ছোট ছোট কিছু মুখ—যাদের হাতে এখন রঙপেন্সিল আর বাংলা বই থাকার কথা ছিল, তাদের হাতে জ্বলছে গরম চায়ের কাপ, কিংবা মাথায় চেপে বসেছে তিন-চারটি কাঁচা ইট।
আমরা যারা প্রতিদিন ক্লাসরুমে বসে নতুন নতুন স্বপ্ন বুনি, আমাদের ঠিক পাশেই বাস করে আরেকটি জগৎ। সেই জগতের শিশুদের কল্পনায় কোনো রাজপুত্র বা মহাকাশচারী হওয়ার গল্প থাকে না; তাদের কল্পনায় থাকে শুধুই দিনশেষে একমুঠো ভাতের নিশ্চয়তা।
নদীর চরের শিমুল আর তার না বলা গল্প
গত মাসে সিরাজগঞ্জের যমুনা নদী ঘেঁষে গড়ে ওঠা এক ইটভাটায় গিয়েছিলাম তথ্য সংগ্রহের কাজে। সেখানে দেখা হয় ১২ বছরের শিশু শিমুলের সাথে। ধূসর ধূলায় আচ্ছন্ন তার শরীর, চোখের কোণে ক্লান্তি আর বয়সের তুলনায় অনেকটাই ভারী তার দীর্ঘশ্বাস। শিমুলকে যখন জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি স্কুলে যাও না?” সে হালকা হেসে লালচে হয়ে যাওয়া ইটগুলোর দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল, “স্কুলে গেলে আম্মার ওষুধ কিনবো কেমনে ভাই? বাপে তো নদীর ভাঙনে জমিজমা সব হারিয়ে কাজে নামতে পারছে না।”
শিমুলের এই একটা বাক্য আমাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। যে বয়সে খেলনা বা রঙিন বইয়ের বায়না করার কথা, সেই বয়সে শিমুলের মাথায় পুরো পরিবারের দায়িত্ব। শিমুলের স্বপ্ন ছিল সে বড় হয়ে পুলিশ হবে, পাড়ার খারাপ মানুষকে ধরবে। কিন্তু এখন তার সমস্ত জগত আটকে গেছে কাঁচা আর পাকা ইটের ফাঁকে।
”মাঝে মাঝে রাতে ঘুমানোর সময় কল্পনা করি, আমি বড় একটা ক্লাসরুমে বসে আছি। স্যার বোর্ডে লিখছেন, আর আমি খাতায় কাটাকুটি খেলছি। কিন্তু সকাল হলেই হাতুড়ির টুংটাং শব্দে সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়।” — শিমুল (১২)
পরিসংখ্যানের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা রক্তাক্ত শৈশব
সরকারি-বেসরকারি নানা পরিসংখ্যানে আমরা দেখি দেশে কত লাখ শিশু শ্রমে নিয়োজিত। কিন্তু সংখ্যার খাতায় কি লেখা থাকে শিমুলদের আঙুলের ক্ষতের গল্প? সেখানে কি লেখা থাকে কীভাবে ধুলোবালি ওদের ফুসফুসকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে? আইন কাগজে-কলমে শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত করা নিষিদ্ধ করেছে, বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থাও করেছে। তবে বাস্তবতার রুক্ষ জমিতে দারিদ্র্য সেই আইনগুলোকে ঢেকে ফেলে।
আমার মনে হয়, সমস্যাটা শুধু দারিদ্র্যের নয়; সমস্যাটা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিরও। আমরা প্রতিদিন রাস্তার মোড়ে কোনো ছোট শিশুকে ভারী কাজ করতে দেখেও চোখ ফিরিয়ে নিই। আমরা ধরে নিয়েছি—ওদের জীবনটাই এমন। এই স্বাভাবিকীকরণই তাদের প্রতি সবচেয়ে বড় সামাজিক অন্যায়।
আশার আলো ও একটি কিশোরের আকুতি
আমরা কি পারি না শিমুলদের মতো হাজারো শিশুকে তাদের হারিয়ে যাওয়া শৈশব ফিরিয়ে দিতে? প্রতিটি এলাকায় যদি স্থানীয় মানুষেরা উদ্যোগ নেয়, যদি বিদ্যালয়গুলোতে কাজের ফাঁকে অল্প সময়ের জন্য হলেও এই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা যায়, তবে হয়তো কোনো একটা পথ বের হতে পারে।
একজন ১৬ বছরের শিক্ষার্থী হিসেবে আমার স্বপ্ন—একদিন সকালে উঠে দেখব রাস্তার মোড়ে কোনো শিশু আর ইটভাটার ভারী ঝুড়ি মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে নেই। প্রতিটি শিশুর কাঁধে থাকবে একটা স্কুলব্যাগ, আর চোখে থাকবে রঙিন ভবিষ্যতের স্বপ্ন। শৈশব কোনো বঞ্চনার গল্প হওয়া উচিত নয়, শৈশব হওয়া উচিত প্রতিটি মানুষের সবচেয়ে সুন্দর ও সুরক্ষিত অধ্যায়।
জারিফ ইবতিশাম (দশম শ্রেণী, সিরাজগঞ্জ কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজ)