শীতকাল এলেই গ্রামবাংলার আঙিনায় শুরু হয় পিঠার রঙিন মৌসুম। ভোরের কুয়াশা, মাটির চুলার আগুন আর খেজুর রসের মিষ্টি গন্ধে ভরে ওঠে চারপাশ। তবে এই বছর মাগুরার শালিখা উপজেলার চেনা দৃশ্য কিছুটা বদলে গেছে। খেজুর রসের তীব্র ঘাটতির কারণে ঐতিহ্যবাহী রসের পিঠা এখন চিনি ও দুধ দিয়ে তৈরি হচ্ছে। যেন দুধ ও চিনি দিয়ে সেই স্বাদ খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায়, গাছি সংকট এবং আবহাওয়ার অনুকূলে না থাকার কারণে এ বছর পর্যাপ্ত রস সংগ্রহ সম্ভব হয়নি। ফলে বাজারে খেজুর রসের দাম কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি অনেক এলাকায় রস পাওয়াই যাচ্ছে না।
শালিখা উপজেলার বাহিরমল্লিকা গ্রামের গৃহিণী সৃষ্টি বিশ্বাস বলেন, আগে ভোরে খেজুর রস সংগ্রহ করে ভেজানো পিঠা বানানো হতো। এখন রসের ঘাটতির কারণে বাধ্য হয়ে চিনি ও দুধ দিয়ে পিঠা ভিজাতে হচ্ছে। স্বাদ আর আগের মতো হয় না।
শতখালী ইউনিয়নের গাছি আব্দুল কুদ্দুস বলেন, আগে গ্রামে খেজুর গাছের সংখ্যা প্রচুর ছিল। কিন্তু রাস্তা, ঘরবাড়ি ও ইটভাটার জন্য অনেক গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। সঙ্গে শীতও আগের মতো পড়ছে না, তাই রসও কমে গেছে।
বাজারে ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও কোথাও খেজুর রস মিললেও প্রতি লিটার দামের পরিমাণ ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। ফলে বেশিরভাগ পরিবার ঐতিহ্য ধরে রাখতে বিকল্প হিসেবে চিনি-দুধের পিঠার ওপর নির্ভর করছে।
শালিখা বাজারের এক পিঠা বিক্রেতা বলেন, এখন ক্রেতারা ভেজানো রসের পিঠা চাইলে খেজুর রসের কথা আর জিজ্ঞেস করেন না। সবাই জানে, রস নেই। তাই বিক্রি হচ্ছে চিনি-দুধের পিঠা। খাদ্যাভ্যাসে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু মানুষের পিঠার প্রতি আগ্রহ কমেনি। সকাল-বিকেল এখনও পিঠার দোকানে ভিড় লক্ষ্য করা যায়। তবে প্রবীণরা আক্ষেপ করেন, খেজুর রসের আসল স্বাদ ও ঘ্রাণ নতুন প্রজন্ম ঠিকভাবে পাচ্ছে না।
উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, শালিখা উপজেলায় বর্তমানে ২০ হাজারের বেশি খেজুর গাছ রয়েছে, যা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানবসৃষ্ট কারণে এই সংখ্যা দিন দিন কমছে। ফলে ক্রেতারা পর্যাপ্ত খেজুর রস ও গুড় থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আবুল হাসনাত জানান, খেজুর গাছের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। তাই নতুন গাছ রোপণ করা, বিদ্যমান গাছের যথাযথ পরিচর্যা এবং নির্বিচারে গাছ কর্তন রোধ করা প্রয়োজন। তাহলেই ভবিষ্যতে খেজুর রস, গুড় ও পাটালি চাহিদা অনুযায়ী পাওয়া সম্ভব হবে।
স্থানীয় সচেতনরা মনে করেন, শালিখা উপজেলায় খেজুর রসের সংকট কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার অভাবের ফল। নির্বিচারে গাছ কাটা, অবকাঠামো নির্মাণ এবং গাছিদের পেশা থেকে সরে যাওয়ার কারণে খেজুর রসের ঐতিহ্য আজ হুমকির মুখে। তারা বলেন, যদি এখনই পরিকল্পিতভাবে খেজুর গাছ রোপণ, বিদ্যমান গাছের যত্ন ও গাছিদের উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম খেজুর রসের প্রকৃত স্বাদ ও ঐতিহ্য থেকে বঞ্চিত হবে।