সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে দেশের সর্ববৃহৎ তাঁত কাপড়ের হাটের সরকারি জায়গায় প্লট তৈরি করে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে সিরাজগঞ্জ-৬ আসনের সাবেক এমপি মনজুর কাদেরের বিরুদ্ধে। এনায়েতপুর গরুর হাটে প্রায় ৬ বিঘা জমিতে ৪৬২টি প্লট তৈরি করে গত দেড় বছর ধরে বিক্রি করছেন তিনি। এতে প্রায় ১৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের আগষ্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের সঙ্গে যোগসাজস করে গোপনে এসব প্লট বিক্রি করেছেন।
মেজর (অব.) মনজুর কাদের সিরাজগঞ্জ-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির মনোনয়ন পেয়েছিলেন। তবে এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে জোটগত নির্বাচন করায় বঞ্চিত হন তিনি।
এ বিষয়ে গত ১৫ ডিসেম্বর এনায়েতপুর গ্রামের জাহেদ জহুরুল নামে এক ব্যক্তি হাটের সরকারি জমিতে প্লট করে বিক্রির বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন চেয়ারম্যান বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অনুলিপি দেওয়া হয়েছে এলজিআরডি উপদেষ্টাসহ মাঠ প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের কাছে।
লিখিত অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৮৫ সালে শাড়ী, লুঙ্গি, গামছাসহ তাঁত পণ্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনাবেঁচার জন্য এনায়েতপুর হাটটি বসে। ২০০৪-০৫ অর্থবছরে সরকারি বরাদ্দে হাটটি সম্প্রসারণ করা হয়। হাটের পাশে পাউবোর মালিকানাধীন খাল-জলাশয় ভরাট করে ৩১ দশমিক ৩৮ একর বিস্তৃত করা হয়। বর্তমানে ৭ শতাধিক দোকান রয়েছে। সপ্তাহে রোববার ও বুধবার প্রায় ৪ হাজার তাঁতী তাঁতপণ্য নিয়ে এ হাটে বসেন। এছাড়াও বৃহস্পতিবার লুঙ্গীর হাটেও ৩ হাজারর মত তাঁতী আসে। আর প্রতি শুক্রবার ৬ বিঘা সরকারী জায়গার ওপর বসে গরু-ছাগলর হাট।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিগত ১৭ বছর এলাকায় অনুপস্থিত মনজুর কাদের চলতি অর্থবছরে তার ম্যানেজার ও স্থানীয় বিএনপি নেতা আনিছুর রহমানকে দিয়ে ৪০ শতাংশ বেশি মূল্যে ৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকায় হাটটি ইজারা নেন। ইজারা নেওয়ার পর থেকেই হাটের জায়গা বিক্রির পায়তারা করেন তিনি। এনায়তপুর গরুর হাটের প্রায় ৬ বিঘায় জমিতে ১২ স্কয়ার ফিট করে ৪৬২টি প্লটের নকশা করেন। এসব প্লট ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা দরে বিক্রি শুরু করেন।
অনুসন্ধানে প্লট বিক্রির বেশ কয়েকটি চুক্তিপত্র এ প্রতিনিধির হাতে আসে। যেখানে “সমঝোতা চুক্তিপত্র” শিরোনামে প্রমিন্যান্ট টেক্সটাইলের পক্ষে ম্যানেজিং ডাইরেক্টর মনজুর কাদের স্বা্ক্ষরিত প্রথম পক্ষ হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন এবং ক্রেতা দ্বিতীয় পক্ষ হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন। ওই চুক্তিনামার মাধ্যমে প্রতিটি প্লট ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকায় বিক্রির করা হয়েছে। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে এভাবেই প্লট বিক্রি করে চলেছেন তিনি।
তবে ২০২৪-২৫ সালে এসব প্লট বিক্রি করলেও সমঝোতা চুক্তিনামায় ২০১০ সালের তারিখ দেখিয়ে ভয়ংকর জালিয়াতি করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই ভয়ংকর জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত এনায়েতপুর হাট বনিক সমিতির সভাপতি মাসুদ রানা, সাবক সভাপতি আব্দুল খালক, হাটের ইজারাদার আনিছুর রহমান ও যুবদলের সাবেক সভাপতি আতাউর রহমান আতাসহ অন্তত ৩০/৪০ জন জড়িত রয়েছেন।
বাবর আলী নামে ব্যবসায়ী বলেন, দেড় বছর আগে আমি ৫টি প্লট নিয়েছি ১৬ লাখ ২৫ হাজার টাকা । টাকা দিয়েছি আতাউর নামে একজনের কাছে। দলিল দিয়েছেন মনজুর কাদের। এখনো প্লট বুঝে পাইনি।
ইব্রাহিম নামে অপর একজন বলেন, ২০২৪ সালে তিনটি প্লটের জন্য আমি টাকা দিয়েছি। প্রতিটির মূল্য ৩ লাখ ২৫ হাজার। টাকা দিয়েছেন ২০২৪ সালে, চুক্তিপত্রে ২০১০ সালের তারিখ কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ওইটা তো আমি বলতে পারবো না। আমি মালয়েশিয়ায় ছিলাম। তবে সবার চুক্তিপত্রে ২০১০ সালের তারিখ রয়েছে।
শফিকুল ইসলাম শফি নামে এক ব্যক্তি বলেন, আমি একটি প্লট নিয়েছি। ৪-৫ মাস আগে টাকা দিয়েছি। এখনো প্লট বুঝে পাইনি।
প্রমিন্যান্ট টেক্সটাইলের ম্যানেজার ও এনায়েতপুর হাটের ইজারাদার আনিছুর রহমান বলেন, সম্প্রতি কিভাবে প্লট বিক্রি হয়েছে আমি জানিনা। তবে ২০০৮-১০ সালে প্লট তৈরি করে মনজুর কাদের বিক্রি করেছেন। ২০০৬ সালে যখন হাট লাগানো হয় মনজুর কাদের হাটের জায়গা ডেভেলপ করেন এবং লে-আউট প্ল্যান করেন। সেই অনুযায়ী তাঁতীদের বসার শেড করেন। এখানে গরুর হাট ছিল না। গরুর হাটের জায়গা পূর্বপাশে। এই জায়গা সুপার মার্কেটের। আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনেও ১২০টা প্লট ছিল। মজিদ মন্ডল এমপি ছিলেন, তিনি সেগুলো ভেঙে দিয়েছেন। বর্তমানে হাটের ২০ একর জায়গাই অবৈধ দখলদারদের দখলে রয়েছে বলে জানান তিনি।
চৌহালী উপজেলার সদিয়া চাঁদপুর ইউনিয়ন উপ-সহকারি ভূমি কর্মকর্তা আশরাফ আলী বলেন, প্লট বিক্রির বিষয়ে আমি জানিনা, তবে এখানে ঘর তোলা হয়নি। এটা ১ নম্বর খাস খতিয়ানের জায়গা। কারও বিক্রি করার এখতিয়ার নাই। যদি ডিসি স্যার দীর্ঘমেয়াদী লিজ দেন তাহলে তিনি বিক্রি করতে পারেন। তবে আমার জানামতে এই জায়গা লিজ দেওয়া হয়নি।
চৌহালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম খোদাদাদ হোসেন বলেন, কোন সরকারি সম্পত্তি বিক্রির এখতিয়ার কারও নেই। বিষয়টি আমাদের জানা নেই। আপনার মাধ্যমে জানলাম। আমি এসিল্যান্ডকে বিষয়টি দেখতে বলছি।
দুর্নীতি দমন কমিশন সমন্বিত কার্যালয় পাবনার পরিচালক সাধন কুমার সূত্রধর বলেন, অভিযোগের অনুলিপি এখনো পাইনি। তবে সরকারি জায়গা বিক্রি অপরাধ। অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, সরকারি হাটের জায়গা প্লট করে বিক্রির এখতিয়ার কারও নেই। এ ব্যাপারে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে মেজর মনজুর কাদেরের মোবাইলে বার বার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।