আধিপত্য বিস্তার ও রক্ষার যুদ্ধে আজ অসহায় বিশ্বের সাধারণ মানুষ। মানবতা, মানবাধিকার ও সভ্যতার মুখোশধারী বিশ্বনেতৃত্বের আস্ফালন ও শক্তিমত্তার মহড়ায় নিদারুণভাবে বিপন্ন মানবতা ও বিশ্ব অর্থনীতি।
এই কঠিন সময়ে একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। পৃথিবীর বর্তমান পরিস্থিতিতে যখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে তখন একজন মুসলিম হিসেবে হা-হুতাশ না করে এবং আতঙ্কগ্রস্ত না হয়ে কয়েকটি পরিকল্পিত ও ইমানি পদক্ষেপ গ্রহণ আমাদের সম্ভাব্য সংকট নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
এক. মিতব্যয়ী হওয়া ও অপচয় বর্জন করা : ইসলাম আমাদের সব সময় মিতব্যয়ী হতে নির্দেশ করে। মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের গুণ-বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘আর তারা যখন ব্যয় করে, তখন অপচয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না; বরং তাদের পন্থা হয় এ দুইয়ের মধ্যবর্তী (ভারসাম্যপূর্ণ) (সুরা ফুরকান)।’ দুঃখজনক বিষয় হলো, সাধারণ অবস্থায় আমরা মিতব্যয়ী হওয়ার কথা ভুলে যাই এবং সামর্থ্য আছে বলে খেয়ালখুশিমতো ব্যয় করি। সংকটকালে অনেকে ঠিকই মিতব্যয়ী হওয়ার গুরুত্ব অনুধাবন করি। আবার অনেকে এই কঠিন সময়েও ব্যয়-ব্যবহারে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিই না। অথচ সংকটের সময়ে টিকে থাকার প্রধান হাতিয়ার হলো মিতব্যয়িতা। ইসলাম অপচয়কে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। কোরআন মাজিদে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই। (সুরা বনি ইসরাঈল)।’ সুতরাং বর্তমান যুদ্ধাবস্থা তো বটেই; এমনকি সাধারণ পরিস্থিতিতেও আমাদের জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ব্যবহারে মিতব্যয়ী হতে হবে। সুসময়ে যে যতটুকু অপচয় ও অপরিমিত ব্যয় করে, কঠিন সময়ে দেখা যায় তাকে ততটুকু ভুক্তভোগী হতে হয়। তবে মিতব্যয়িতা মানে কৃপণতা নয়, বরং সম্পদের সঠিক ও পরিমিত ব্যবহার।
নবী করিম (সা.) খুবই সামান্য পানি দিয়ে অজু ও গোসল সারতেন। সমুদ্রে অজু করলেও তিনি অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন।
দুই. ভোগ্যপণ্য মজুতদারি থেকে বিরত থাকা : সংকটের কথা শুনলে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে বাজারে হুমড়ি খেয়ে পড়েন এবং মাসের পর মাস খাদ্য মজুত করেন। এর ফলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয় এবং দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘অপরাধী ছাড়া কেউ মজুতদারি করে না (মুসলিম)।’
সামাজিকভাবে এটি একটি স্বার্থপর আচরণ। যখন আপনি অতিরিক্ত মজুত করছেন, তখন অন্য একটি পরিবার হয়তো অভুক্ত থাকছে। তাই নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত মজুত না করে সবার জন্য বাজারের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা ইমানি ও মানবিক দায়িত্ব।
তিন. আতঙ্কিত না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করা : ভয় ও আতঙ্ক মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করে। সংকট আসতেই পারে, কিন্তু মুমিন হিসেবে আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে যে রিজিকের মালিক আল্লাহ। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। (সুরা তালাক)।’
আতঙ্ক মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করে, যা মানসিক চাপ ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। ধৈর্য ও সাহসের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করাই হলো প্রকৃত সফলতা। আল্লাহর প্রতি ভরসা আমাদের মনোবল বাড়িয়ে দেয়, মানসিক শক্তি জোগায়-যা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অনেক বড় পাথেয়র ভূমিকা রাখে।
চার. পতিত জমি আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধি করা : খাদ্যসংকট মোকাবিলায় উৎপাদন বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। নবী করিম (সা.) কৃষিকাজে উৎসাহিত করে বলেছেন, ‘যদি কোনো মুসলমান কোনো চারা রোপণ করে অথবা শস্য বপন করে এবং তা থেকে কোনো মানুষ বা পশুপাখি ভক্ষণ করে, তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে। (সহিহ বুখারি)।’ দেশের প্রতিটি ছোটবড় খালি জায়গায় সবজি বা ফলমূল চাষ করলে তা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় বড় অবদান রাখে। এটি কেবল অর্থনৈতিক সমাধান নয়, বরং এটি একটি ইবাদতও বটে। বাড়ির আঙিনা বা ছাদ কাজে লাগিয়ে আমরা নিজেদের প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদা মেটাতে পারি।
পাঁচ. ইস্তেগফার ও দোয়া করা : সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিপদ দূর হওয়ার জন্য ইস্তেগফার এবং আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা। সংকট কেবল বস্তুগত কারণে আসে না, অনেক সময় তা আমাদের পরীক্ষার জন্যও আসে। তাই বেশি বেশি তওবা ও ইস্তেগফার করা প্রয়োজন। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি দ্বারা সমৃদ্ধ করবেন। (সুরা নুহ)।’ মহান আল্লাহ আমাদের সব প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তাঁর রহমতের চাদরে ঢেকে রাখুন। সংকটময় পরিস্থিতি উত্তরণের পথ বাতলে দিন। অত্যাচারীদের অত্যাচার মোকাবিলার সামর্থ্য দিন।
জুমার মিম্বর থেকে
গ্রন্থনা : নুরুল ইসলাম তানঈম