সময়টা দীর্ঘ চার দশকের। এই দীর্ঘ ৪০টি বছর বুকের ভেতর চাপা কষ্ট আর শেকড়ের টান লুকিয়ে রেখেছিলেন তিনি। অবশেষে সব অপেক্ষার অবসান ঘটলো। ‘শেরপুর’ নামের বিভ্রাট আর প্রযুক্তির আশীর্বাদ ফেসবুকের কল্যাণে ৪০ বছর পর নিজের বাবার ভিটায় ফিরে এলেন হারিয়ে যাওয়া আঞ্জুমানারা। তাকে একনজর দেখতে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার গাড়িদহ ইউনিয়নের মহিপুর কলোনি এলাকায় ভিড় জমিয়েছেন শত শত উৎসুক জনতা ও আত্মীয়-স্বজন। আনন্দ-অশ্রুতে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে পুরো এলাকায়।
আঞ্জুমানারা মহিপুর কলোনি এলাকার মৃত আবসার আলীর মেয়ে। প্রায় চার দশক আগের কথা। অভাবের তাড়নায় এক প্রতিবেশী চাচার হাত ধরে কাজের সন্ধানে পাড়ি জমিয়েছিলেন রাজধানী ঢাকায়। কিন্তু সেখানে গৃহকর্মীর কাজ করতে গিয়ে চরম নির্যাতনের শিকার হন তিনি। অভিমান আর কষ্টে একপর্যায়ে সেই বাসা থেকে বেরিয়ে পড়েন। এরপর পথে এক সহৃদয় মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়, যিনি তাকে একটি এতিমখানায় রেখে আসেন। সেখান থেকেই শুরু হয় আঞ্জুমানারার জীবনসংগ্রাম। এতিমখানা থেকে একসময় কাজের খোঁজে যোগ দেন গার্মেন্টস কারখানায়। সেখানে কাজ করার সুবাদেই পরিচয় হয় মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল থানার কালাপুর ইউনিয়নের বীরনগর গ্রামের আতাউর রহমানের ছেলে সাইফুল ইসলামের সঙ্গে। একদিন কারখানায় কাজ করার সময় সাইফুলের হাত কেটে গেলে পরম মমতায় তার সেবাযত্ন করেন আঞ্জুমানারা। সেই মায়াতেই বাঁধা পড়েন দুজন। প্রণয় থেকে পরিণয়।
বিয়ের পর দুজনে দুই বছর চাকরি করেন এবং পরে স্বামীর গ্রামের বাড়ি শ্রীমঙ্গলে চলে যান। এরপর অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে স্বামী সাইফুল পাড়ি জমান প্রবাসে, সেখানে কাটান চার বছর। দীর্ঘ এই ৪০ বছরে আঞ্জুমানারা এক মেয়ে ও তিন ছেলের জননী হয়েছেন। মেয়ে সালমা খাতুন, ছেলে মোহাম্মদ সালমান, রেদওয়ান ও শেহজাদ। বড় ছেলেকে বিয়ে দিয়েছেন, তার ঘরে রয়েছে চার বছরের নাতি ইয়াসিন আলী। স্বামী-সন্তান নিয়ে এখন তার ভরা সংসার।
সংসার জীবনে সুখ থাকলেও বুকের ভেতর সবসময় রক্তক্ষরণ হতো জন্মভূমির জন্য। বাবার বাড়ি ফেরার আকুতি থেকে কয়েকবার চেষ্টাও করেছেন ৩০ বছর আগে। কিন্তু ‘শেরপুর’ নামের বিভ্রাটে বগুড়ার শেরপুরের বদলে তিনি ভুল করে চলে যান ময়মনসিংহ জেলার শেরপুরে! সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে এরপর কেটে যায় আরও ৩০ বছর। অবশেষে প্রযুক্তির আশীর্বাদ ফেসবুকের মাধ্যমে তিনি তার প্রকৃত ঠিকানা বগুড়ার শেরপুরের মহিপুর কলোনির সন্ধান পান।
পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ হওয়ার পর স্বামী-সন্তানদের নিয়ে ছুটে আসেন নাড়ির টানে। দীর্ঘদিন পর বাড়িতে পা রেখেই স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন তিনি। বাড়ির আঙিনায় কোথায় কী ছিল, কোন আত্মীয়ের কী নাম সব যেন নিখুঁতভাবে বলে যেতে থাকেন। তার স্মৃতিচারণ শুনে উপস্থিত আত্মীয়-স্বজন নিশ্চিত হন যে, এই তাদের সেই হারিয়ে যাওয়া আঞ্জুমানারা। এরপরই শুরু হয় একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্নার রোল। দীর্ঘ বিরহের পর এই মিলনমেলা দেখতে আশপাশের গ্রাম থেকেও উপচে পড়া ভিড় জমে যায়।
বোনকে ফিরে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা বড় বোন আলোয়া খাতুন। অশ্রুসিক্ত নয়নে তিনি বলেন, আঞ্জুমানারার আমরা অনেক খোঁজখবর নিয়েছি, কিন্তু কোনো সন্ধান পাইনি। অনেকেই বলছিল সে হয়তো আর বেঁচে নেই। আমরা আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। আজ তাকে জীবিত পেয়ে এবং তার ছেলে মেয়েদের দেখে আমাদের যে কী আনন্দ হচ্ছে, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না।
দীর্ঘ ৪০ বছরের জমানো কষ্ট আর স্বজনের ভালোবাসা না পাওয়ার আক্ষেপ নিয়ে আঞ্জুমানারা আবেগাল্পুত কণ্ঠে বলেন, এই দীর্ঘ ৪০টি বছর আমি আত্মীয়-স্বজনের কোনো ভালোবাসা পাইনি। কিন্তু আজ নিজের আপন ঠিকানায় ফিরে আমার খুব ভালো লাগছে। তবে কষ্ট একটাই, এর মাঝে আমার অনেক আত্মীয়-স্বজন পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন, তাদের এক নজর দেখার সুযোগ আমার হলো না। তারপরও আজ বাকি স্বজনদের ফিরে পেয়ে আমার বুকের পাথর নেমে গেছে।
হারিয়ে যাওয়া মেয়ের এমন ফিরে আসার গল্প এখন পুরো শেরপুর উপজেলার মানুষের মুখে মুখে। সবাই বলছেন, শেকড়ের টান কখনো মুছে যাওয়ার নয়, আঞ্জুমানারা তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।