সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ০৩:০৭ অপরাহ্ন
নোটিশ:
তথ্য ও প্রচার মন্ত্রণালয় নিবন্ধনকৃত অনলাইন নিউজ পোর্টাল দ্য পিপলস্ নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকে সারা দেশে জেলা প্রতিনিধি নিয়োগ করা হবে। মোবাইল: ০১৭১১-১১৬২৫৭, ০১৭১২-৪০৭২৮২ ' ই-মেইল : thepeopelesnews24@gmail.com

গণপূর্তে নেতৃত্ব বদলি ঘিরে বিতর্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক: / ৫ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬

জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা, বদলি বাণিজ্য ও পুরনো অভিযোগে প্রশ্নের মুখে নতুন প্রধান প্রকৌশলী
গণপূর্ত অধিদপ্তরের শীর্ষ পদে সাম্প্রতিক পরিবর্তন এবং পরবর্তী ব্যাপক বদলি কার্যক্রমকে ঘিরে দপ্তরজুড়ে তীব্র আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জ্যেষ্ঠতার নীতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
গত ২৮ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে দীর্ঘদিন চলতি দায়িত্বে থাকা প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতারকে সরিয়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (রিজার্ভ) পদে সংযুক্ত করা হয়। একই প্রজ্ঞাপনে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (মেট্রো জোন) খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়।
জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষার অভিযোগ
গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, গ্রেডেশন তালিকায় তার আগে একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা থাকা সত্ত্বেও অন্তত পাঁচজন কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে দায়িত্ব দেওয়ায় প্রকৌশলীদের একটি অংশে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, অতীতেও এমন নজির থাকলেও ধারাবাহিকভাবে জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও ন্যায়সংগত পদায়ন ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

দায়িত্ব নিয়েই ব্যাপক বদলি
দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই শুরু হয় বড় ধরনের বদলি কার্যক্রম। ৮ নভেম্বর এবং ১৭ থেকে ১৮ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে জারি করা একাধিক আদেশে নির্বাহী প্রকৌশলী, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী ও সহকারী প্রকৌশলী পর্যায়ের প্রায় শতাধিক কর্মকর্তাকে দেশের বিভিন্ন জেলায় পদায়ন করা হয়।

অভিযোগ উঠেছে, এসব বদলির একটি বড় অংশ ছিল তথাকথিত ‘প্রাইজ পোস্টিং’। প্রতিবেদকের হাতে আসা অন্তত ৬৫ জন কর্মকর্তার একটি তালিকায় এমন পদায়নের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে নিয়োগ এবং রিজার্ভ পদ থেকে আকস্মিক পুনর্বহালের পেছনে প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের বিষয় জড়িত থাকতে পারে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

গ্রিন কোজি কটেজ’ ট্র্যাজেডি নিয়ে নতুন প্রশ্ন
রাজধানীর বেইলি রোডে ২০২৪ সালের শুরুর দিকে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সাততলা বাণিজ্যিক ভবন ‘গ্রিন কোজি কটেজ’ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ওই ঘটনায় প্রাণ হারান ৪৬ জন এবং আহত হন আরও অন্তত ১৩ জন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকা, জরুরি নির্গমন পথের অভাব এবং সংকীর্ণ সিঁড়ির মতো কারিগরি ত্রুটির কারণে প্রাণহানির মাত্রা বেড়েছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভবনটির নকশা অনুমোদনের সময় রাজউকের অথরাইজড অফিসার হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী।

তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠলেও পরবর্তীতে চার্জশিট থেকে তার নাম প্রত্যাহার করা হয়। এ সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, বড় ধরনের দুর্ঘটনায় কারিগরি অনুমোদনদাতাদের দায় কতটা নির্ধারণ করা হয়েছে।

অতীতের অভিযোগ ও বিতর্ক
খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে অতীতেও একাধিক অভিযোগ উঠেছিল। এর মধ্যে রয়েছে পিএইচডি ডিগ্রি সংক্রান্ত জটিলতা, উচ্চতর শিক্ষাছুটিতে অনিয়ম, দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থান এবং প্রশাসনিক বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ভুয়া সনদের ভিত্তিতে শিক্ষাছুটি গ্রহণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে লঘুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল এবং এক বছরের জন্য তার বেতন স্কেল স্থগিত রাখা হয়। এছাড়া পাবনায় দায়িত্ব পালনকালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ‘গ্রিন সিটি’ নির্মাণে টেন্ডার সিন্ডিকেট গঠনের অভিযোগও ওঠে।
তবে অভিযোগ রয়েছে, এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ও প্রকাশ্য তদন্ত কিংবা জবাবদিহির প্রক্রিয়া কখনও দৃশ্যমান হয়নি।

রাজনৈতিক যোগাযোগের গুঞ্জন
দপ্তরের একাধিক অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও দায়িত্ব ধরে রাখতে খালেকুজ্জামান চৌধুরী সক্রিয় তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি তাকে রাজধানীর গুলশান এলাকায় এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বাসভবন থেকে গভীর রাতে বের হতে দেখা গেছে বলেও গুঞ্জন রয়েছে।

নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পরও প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে তার যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রশাসনিক বিভাজন ও উদ্বেগ
বদলি কার্যক্রম, পদায়ন নিয়ে অসন্তোষ এবং অতীতের অভিযোগকে কেন্দ্র করে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে স্পষ্ট বিভাজনের চিত্র তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের আশঙ্কা, এ পরিস্থিতি দপ্তরের স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ও ভবন নিরাপত্তা তদারকির মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী সংস্থাগুলোতে নেতৃত্ব নির্বাচন, পদায়ন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের শীর্ষ নেতৃত্বে এই পরিবর্তন কেবল প্রশাসনিক রদবদলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা জ্যেষ্ঠতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা নিয়ে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্তই পারে চলমান বিতর্কের গ্রহণযোগ্য সমাধান দিতে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর