বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ৪৬৮টি ডাটা এন্ট্রি অপারেটর পদে নিয়োগকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত এবং বৈষম্যের এক নজিরবিহীন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের ‘ভারী বর্ষণের’ সতর্কতা এবং সাধারণ প্রার্থীদের তীব্র আপত্তির মুখেও আগামীকাল ১০ জুলাই (শুক্রবার) লিখিত পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে কমিশন। এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ‘অটোপাস’ সংস্কৃতি এবং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ কর্মীদের ছাঁটাইয়ের অভিযোগে এখন উত্তাল নির্বাচন ভবন।
আজ ৯ জুলাই আবহাওয়া অধিদপ্তর সারা দেশে আগামী ৪৮ ঘণ্টা ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের সতর্কতা জারি করেছে। পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস এবং শহরাঞ্চলে জলাবদ্ধতার আশঙ্কার মধ্যেই কালকের পরীক্ষা আয়োজনের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হাজারো পরীক্ষার্থী। দূর-দূরান্ত থেকে আসা পরীক্ষার্থীরা বলছেন, আদালতের নির্দেশনার মাত্র দুই দিনের মাথায় পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড ইস্যু করা হয়েছে। পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সময় না দিয়ে এবং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া উপেক্ষা করে এই পরীক্ষা গ্রহণ মূলত একটি পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার পাঁয়তারা।
সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ‘অটোপাস’ পদ্ধতি। অভিযোগ উঠেছে, যারা উচ্চ আদালতে রিট করেছিলেন, সেই ৭৪১ জন প্রার্থীকে কোনো প্রিলিমিনারি পরীক্ষা ছাড়াই সরাসরি লিখিত পরীক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সাধারণ প্রার্থীদের প্রশ্ন—যেখানে নিয়োগের স্বচ্ছতা ও সমতার নীতি থাকার কথা, সেখানে একদল প্রার্থীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া কেন? এটি কি কোনো বড় ধরনের ‘নিয়োগ বাণিজ্যের’ অংশ?
জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) নিবন্ধন অনুবিভাগে ২০০৭ সাল থেকে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে প্রায় ১,১০০ জন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত ডাটা এন্ট্রি অপারেটর কাজ করে আসছেন। ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও জাতীয় পরিচয়পত্রের মতো সংবেদনশীল কাজে নিয়োজিত এই অভিজ্ঞ কর্মীদের স্থায়ীকরণের দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু তাঁদের স্থায়ীকরণ তো দূরের কথা, উল্টো গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দাবি আদায়ের আন্দোলনের কারণে ১৫ জনকে চাকরিচ্যুত এবং ১৩ জনকে কয়েকশ মাইল দূরে বদলি করা হয়েছে। বর্তমানে কর্মরত অভিজ্ঞদের বাদ দিয়ে নতুন করে এই ‘রহস্যজনক’ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিপাকে পড়েছেন শত শত পরিবার।
গত ৭ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে শূন্য পদ পূরণের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও ইসির ২০১৯ সালের নিয়োগ কার্যক্রম আজও আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল বা নিষ্পত্তি করা হয়নি। সেই আইনি জটিলতা স্পষ্ট না করেই নতুন করে তড়িঘড়ি পরীক্ষা নেওয়ার উদ্যোগকে আইনের ব্যত্যয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিরাজগঞ্জ থেকে আসা এক পরীক্ষার্থী বলেন, “আমরা প্রিলিমিনারি পাস করেও লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় পাইনি। অথচ রিটকারীদের পরীক্ষা ছাড়াই সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। আমরা কি তবে শুধু নামমাত্র পরীক্ষার্থী?” কুমিল্লার এক পরীক্ষার্থী জানান, “ভারী বৃষ্টিতে যাতায়াতই অসম্ভব, সেখানে পরীক্ষা দেব কীভাবে। তাদের দাবি ১. দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে কালকের পরীক্ষা স্থগিত করতে হবে ২. রিটকারীদের ‘অটোপাস’ দেওয়ার বিষয়টি তদন্ত করতে হবে ৩. চাকরিচ্যুত ১৫ জন কর্মীকে পুনর্বহাল এবং শাস্তিমূলক বদলি বাতিল করতে হবে ৪. ২০১৯ সালের নিয়োগের আইনি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান প্রক্রিয়া বন্ধ রাখতে হবে।
নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ নিয়ে এমন লুকোচুরি ও তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত দেশের শিক্ষিত যুবসমাজের মেধার অবমূল্যায়ন এবং সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট তৈরি করছে।