পুঞ্জিভুত ৮৫০ কোটি লোকসান মাথাই নিয়ে জয়পুরহাট চিনিকলে আখ মাড়াই শুরু।জয়পুরহাট চিনিকলে শুরু হয়েছে ৬৩তম আখ মাড়াই মৌসুম। গতবারের (২০২৪-২৫)আখ মাড়াই মৌসুম এর ৫৮ কোটি টাকা লোকসানের বোঝা মাথাই নিয়েই ২০২৫-২৬ আখ মাড়াই মৌসুম শুরু করল দেশের বৃহৎ চিনি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জয়পুরহাট চিনিকল ।
শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর-২০২৫) আখ মাড়াই ও চিনি উৎপাদন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাকসুরা নূর।
চিনিকল চত্বরে এ উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশে বক্তব্য দেন, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এম এ কামাল বিল্লাহ, জয়পুরহাট চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কৃষিবিদ খবির উদ্দিন মোল্ল্যা, জয়পুরহাট স্থানীয় সরকারের উপ- পরিচালক উত্তম কুমার রায়, জেলা জামায়াতের আমির ফজলুর রহমান, জয়পুরহাট সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনিছুর রহমান সহ আরও অনেকে।
এবার চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমে ৩ হাজার ২ একর জমিতে আখ চাষাবাদ হয়েছে। আর এসব জমির ৫৫ হাজার মে:টন আখ থেকে ২ হাজার ৯৭০ মে: টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেস চিনিকল কর্তৃপক্ষ।
চিনিকল ব্যবস্থাপনা পরিচালক কৃষিবিদ খবির উদ্দিন মোল্ল্যা জানিয়েছেন, গতবারের চেয়ে এবার আখের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। এবার আখের মূল্য কুইন্টাল প্রতি মিল গেটে ৬২৫ টাকা। আর বাইরের কেন্দ্রগুলো থেকে ৬১৫ টাকা দরে আখ কেনা হবে।এছাড়াও এবার বিকাশ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আখ চাষিদের আখের মূল্য পরিশোধের উদ্যোগও নিয়েছেন চিনিকল কর্তৃপক্ষ।
উল্লেখ্য, ২০২৪-২৫ আখ মাড়াই মৌসুম শেষে জয়পুরহাট চিনিকলের পুঞ্জিভুত লোকসানের পরিমান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৫১ কোটি টাকা।
জানা গেছে, ১৯৬০ সালে জয়পুরহাট চিনিকল প্রতিষ্ঠিত হয়। আর ১৯৬৩-৬৪ সাল থেকে এই চিনিকলের চিনি উৎপাদনের যাত্র শুরু হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে সরকার এই প্রতিষ্ঠানটিকে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঘোষণা করেন।
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের আওতাধীন এই মিলটি আখ মাড়াই মৌসুম শুরুর পর প্রায় ৩০ বছর লাভ-লোকসান মিলিমিশে চললেও ১৯৯৪-৯৫ আখ মাড়াই মৌসুমের পর থেকে এখন পর্যন্ত আর লাভের মুখ দেখেনি দেশের বৃহত্তর চিনি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জয়পুরহাট চিনিকল। লাভের আশায় মিল কর্তৃপক্ষ আপ্রাণ চেষ্টা ‘অব্যাহত’ রাখলেও প্রতি বছরই মিলটিকে গুনতে হচ্ছে লোকসান,আর ভারি হচ্ছে ঋণের বোঝা। এর ফলে এখন পর্যন্ত মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৫১ কোটি টাকা।
চিনিকল সূত্র জানায়, ২০২৩-২৪ মাড়াই মৌসুমে ৩৭ হাজার ৪৭৫ মেট্রিক টন আখ মাড়াই হয়েছে। এতে করে ১ হাজার ১১৩ মে: টন চিনি উৎপাদন হয়েছে। ওই মৌসুমে ব্যাংক ঋণের সুদসহ প্রতি কেজি চিনি উৎপাদনে ব্যয় হয়েছে ৫২৭ টাকা। আর সুদ ছাড়া ব্যয় হয়েছে ৩৮১ টাকা। উৎপাদিত চিনি বাজারে ১২৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়েছে।
সেই হিসাব অনুযায়ী ১ কেজি চিনিতে লোকসান গুনতে হচ্ছে সুদসহ ৪০২ টাকা ও সুদ ছাড়া ২৫৬ টাকা। ১ কেজি চিনিতে সুদসহ লোকসানের পরিমাণ বেশি। সবমিলিয়ে ওই মৌসুমে প্রায় ৫৩ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। ২০২২-২৩ মৌসুমে লোকসান ছিল ৬৯ কোটি টাকা।
২০২৪-২৫ মৌসুমে ৩ হাজার ২ একর জমিতে আখ চাসবাদ হয়েছিল। এসব জমির ৫০ হাজার মেট্রিক টন আখ মাড়াইয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এতে চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ২৫ মেট্রিক টন। ওই মৌসুমে আখ মাড়াই কার্যক্রম চলছিল ৩৪ দিন।
তৎকালীন জয়পুরহাট চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কৃষিবিদ মো: আখলাছুর রহমান সার্বিক তথ্যাবলি নিশ্চিত করে জানান, আগের তুলনায় দিনদিন আখের আবাদ বাড়ছে। ২০২২-২৩ মৌসুমে ৭৩ লাখ ৬৬ হাজার টাকা চাষিদের মাঝে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। ২০২৩-২৪ মৌসুমেও চাষিদের ভর্তুকি দেওয়া হবে। আর প্রতি মৌসুমে আখের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২২-২৩ আখ মাড়াই মৌসুমে কুইন্টাল প্রতি ৫৫০ টাকা দরে আখ কেনা হলেও এবার ২০২৩-২৪ মাড়াই মৌসুমে ৬০০ টাকা দরে কেনা হবে বলেও জানিয়েছিলেন এই কর্মকর্তা।
স্থানীয় সচেতন মহল,কিছু আখ চাষী এবং মিলের জমি (সন পত্তন নিয়ে ) এক বছরের জন্য চাষাবাদ করে এমন চাষীরা জানান,জয়পুরহাট চিনিকল প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা লোকসান করে, অথচ মিলের নিজস্ব জমিতে আখ চাষ না করে জমি আদী-ও সন পত্তন দিয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতি বছরই পকেট ভারি করছে।এটা তদারকি করার যেন কেউ নেই, এতো বড় একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান, প্রতি মৌসুমে মাত্র ২৮-৩০ দিন মিল চলে, অথচ মিলের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলেই সারা বছর রাজার হালে খেয়ে পড়ে চলে উল্লেখ করে তারা আরও বলেন, এই চিনিকল বেসরকারী খাতে দেওয়ায় ভালো,মাত্র কিছু মানুষের পেট বাঁচানোর জন্য এই মিল রাষ্ট্রয়াত্ব খাতে রাখার কোন প্রয়োজন নেই বলেও তারা মনে করেন।