ইসলামি পরিভাষায় আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য সুবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যাবতীয় পানাহার ও কামাচার হতে বিরত থাকাকে রোজা বলে। রোজা পালনের মাধ্যমে মানুষ লোভলালসা, হিংসাবিদ্বেষ, ক্রোধ-ক্ষোভ ও কাম-মানসিকতা পরিহারের মাধ্যমে আত্মিক দোষত্রুটি সংশোধন করে পরিশুদ্ধ হতে পারে। রোজা একজন ব্যক্তি ও তার মন্দ কাজের মাঝে ঢালস্বরূপ। রসুল (সা.)-এর ফরমান, ‘রোজা হচ্ছে ঢালস্বরূপ’ (বোখারি প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫৪)। রোজা আমাদের আত্মশুদ্ধির প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। রোজা পালনের মাধ্যমে যারা আত্মশুদ্ধি লাভ করে, আদর্শ চরিত্রের অধিকারী হতে পারেন, তারাই সফলতা অর্জন করে থাকে। হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ্ বলেন, ‘রোজা আমার জন্য এবং আমিই এর প্রতিদান দেব’ (আর প্রতিদান হলো মহান আল্লাহ নিজেই) (বোখারি প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫৪)। রোজা মানুষের আমিত্বকে দূর করে আল্লাহর চরিত্রে চরিত্রবান হওয়ার শিক্ষা দেয়। রোজার মাধ্যমে আল্লাহকে পাওয়ার অর্থ হলো নিজের মাঝে আল্লাহর চরিত্র বিকশিত হওয়া। অন্তরের পাপকালিমা বিদূরিত করে হৃদয় মাঝে বিরাজমান আল্লাহর সুপ্ত নুর বিকশিত করার লক্ষ্যে শুদ্ধভাবে রোজা পালনের গুরুত্ব অপরিসীম।
আল্লাহ রোজার মাধ্যমে বান্দাকে পরিশুদ্ধ করতে চান এবং পুরস্কার দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘যদি তোমরা রোজা রাখো; তবে তা হবে তোমাদের জন্য অধিকতর কল্যাণকর; যদি তোমরা তা বুঝতে’ (সুরা আল বাকারা-১৮৪)। আল্লাহর রসুল (সা.) রোজার ফজিলত সম্পর্কে বলেন, ‘আদম সন্তানের প্রতিটি নেক আমল ১০ থেকে ৭০০’ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। এরপর আল্লাহ যতদূর ইচ্ছা করেন। আল্লাহ বলেন, ‘তার সিয়াম, তা আমার জন্য; আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব। সে প্রবৃত্তি এবং পানাহার আমার জন্যই বর্জন করে।’ সিয়াম পালনকারীর জন্য রয়েছে দুটি আনন্দ। একটি আনন্দ তার ইফতারের সময় এবং অন্য আনন্দটি হচ্ছে তার প্রতিপালকের সঙ্গে সাক্ষাতের সময়। সিয়াম পালনকারীর মুখের ঘ্রাণ আল্লাহর কাছে মিশকের ঘ্রাণ অপেক্ষা অধিক সুগন্ধিময় (সুনানু ইবনে মাজাহ, পৃষ্ঠা ১১৮)। রসুল (সা.) বলেন, ‘জান্নাতের একটি দরজার নাম “রায়্যান”। কিয়ামতের দিন সেখান থেকে এ বলে আহ্বান করা হবে; সাওম পালনকারীগণ কোথায়? যে ব্যক্তি সাওম পালনকারী হবে, সে ওই দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে এবং যে ওই দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে, সে কখনো পিপাসার্ত হবে না’ (সুনানু ইবনে মাজাহ্, পৃষ্ঠা ১১৮)। রোজার সামাজিক গুরুত্বও অপরিসীম। রোজা পালনের মাধ্যমে রোজাদার ব্যক্তি ক্ষুধার যন্ত্রণা উপলব্ধি করতে পারে, ফলে তার মধ্যে গরিব-দুঃখী মানুষের প্রতি সহানুভূতি ও ভালোবাসা সৃষ্টি হয়। রোজা পালনকারী ব্যক্তি অন্যায়-অশ্লীল কথাবার্তা পরিহার করে চলে এবং হানাহানি থেকে দূরে থাকে। ফলে সমাজে শান্তি বিরাজ করে। এ ছাড়া আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় একে অন্যকে সাহরি ও ইফতার করিয়ে থাকে এবং অভাবীকে আর্থিক সহযোগিতা করে থাকে। এভাবে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি হয় এবং সামাজিক বন্ধন আরও মজবুত ও শক্তিশালী হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানও রোজা রাখার উপকারিতা স্বীকার করে নিয়েছে। মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা-তিনি যেন দয়া করে আমাদের হাকিকতে রোজা পালনের মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করার তৌফিক দান করেন।
লেখক : গবেষক, কদর রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিকেশন্স, ঢাকা







