রাজধানীর লেক গুলো এখন ময়লার ভাগাড়; দূষণে বিপর্যস্ত, মশা-মাছির প্রজননস্থল আর দুর্গন্ধের উৎস। নাগরিকদের স্বস্তির আশ্রয় হয়ে ওঠার পরিবর্তে ঢাকার লেকগুলো বরং এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। যা তৈরি করছে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি। বিষাক্ত আবর্জনা, দূষণ, দখল আর বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে ঢাকার লেকগুলো ক্রমেই মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ছে।
রাজধানীর অন্যতম অভিজাত এলাকা গুলশান-বনানী ও বারিধারা। বিভিন্ন দেশের দূতাবাস ও কূটনৈতিকদের বাসস্থান রয়েছে এ এলাকাগুলোয়। দেশের অনেক বড় ব্যবসায়ী ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদেরও বসবাস এখানে। এ এলাকায় রয়েছে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ জলাশয়—গুলশান-বনানী লেক। এ জলাশয়কে ২০০১ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু এরপর গত আড়াই দশকেও অভিজাত এলাকার এ লেককে আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। গুলশান লেকে কোথাও কয়েক ইঞ্চি থিকথিকে ময়লার স্তর তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় বর্জ্য পচে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। এ জলাশয় হয়ে উঠেছে মশা-মাছির আবাসস্থল। লেক থেকে আসা দুর্গন্ধে দুই পাশের ভবনের ছাদ কিংবা বারান্দায় বসতে চান না বাসিন্দারা। দুর্গন্ধ আর মশা-মাছি থেকে বাঁচতে বাসার দরজা-জানালা বন্ধ রাখেন অনেকে।
রাজধানীর নদ-নদী ও লেকে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পরীক্ষায় দীর্ঘ সময় ধরে গবেষণা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষক। গবেষক দলের সদস্য অধ্যাপক ফাহমিদা পারভীন জানান, অত্যন্ত দূষিত বলে পরিচিত চীনের সাংহাই নদীর তলদেশে জমাকৃত প্রতি কেজি পলিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ ৮০২টি এবং ইয়াংঝাং নদীর পলিতে ২৮৫টি। অন্যদিকে ধানমন্ডি লেকের প্রতি কেজি পলিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে ৩০ হাজারটি। গুলশান লেকের পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি বেশি। বিভিন্ন উৎস থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক ঢাকার লেকগুলোর তলদেশে গিয়ে জমা হচ্ছে। এতে জলজ জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে ঝুঁকি বাড়ছে মানবস্বাস্থ্যেরও।
কয়েক বছর আগে গুলশান লেকের পানির গুণগত মান নিয়ে স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা করেন। তাতে দেখা যায়, লেকের পানিতে একাধিক সূচকে উদ্বেগজনক অবনতি রয়েছে। গুলশান লেকে মোট দ্রবীভূত পদার্থ (টিডিএস) ও ঘোলাভাব হাতিরঝিলের লেকের তুলনায় বেশি পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে দুই লেকেই কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা, জৈব দূষণের সূচক (বিওডি) এবং রাসায়নিক দূষণের সূচক (সিওডি) নির্ধারিত মান অতিক্রম করেছে। এর ফলে গুলশান লেক ও হাতিরঝিল লেকের পানি ব্যবহার উপযোগিতা হারিয়ে ফেলেছে। এ পানি জলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন গবেষকরা।
রাজধানীর আরেক পুরনো অভিজাত এলাকা ধানমন্ডি। এ এলাকায় আছে সাড়ে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ লেক। গত এক দশকের বেশি সময়ে বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রমে ধানমন্ডি লেক তার সৌন্দর্য হারাচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, নতুন করে লেকটিতে আবাসিক ভবনের পয়ঃবর্জ্যের সংযোগ দেয়া হয়েছে। অবাধে লেকে ফেলা হচ্ছে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিনসহ বিভিন্ন বর্জ্য। এসব কারণে লেকের পানি নষ্ট হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছে। কমে গেছে মাছ ও জলজ উদ্ভিদের পরিমাণ। মানুষের নানা কর্মকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে লেকপারে বসতি গড়া পাখপাখালিও।
সম্প্রতি গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কোথাও কোথাও পানি ও পরিবেশের অবস্থা এতটাই খারাপ যে দুর্গন্ধে টেকা দায়। কালো মিশমিশে নোংরা পানির পাশাপাশি লেকের দুই পাড়ে জমে থাকা আবর্জনায় লেককে ময়লার ভাগাড় বলে মনে হতে পারে। গুলশান-২ থেকে বনানী যাওয়ার পথে দেখা যায় কামাল আতাতুর্ক সড়কের সেতুর অংশে লেক তীব্র দূষণের শিকার। প্রচণ্ড দুর্গন্ধে পথচারীরা নাকে হাত চেপে দ্রুত হেঁটে যাচ্ছেন। দেখা গেল, লেকের দুই পাশেই নানা ধরনের বর্জ্য জমে আছে। পানির ওপর কালচে রঙের গাঢ় আস্তরণ। সেতুর নিচের পাইপ দিয়ে আসছে কালো দুর্গন্ধযুক্ত পানি।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের এক জরিপের তথ্য বলছে, লেকের আশপাশে তিন হাজার ৮৩০টি বাড়ির মধ্যে ২ হাজার ২৬৫টি বা প্রায় ৮৫ শতাংশের সুয়ারেজ লাইনের সংযোগই দেয়া হয়েছে লেকে। সঙ্গে আছে আবর্জনা ফেলা আর দখল। মূলত এ কারণেই লেকের প্রাণ যায় যায় অবস্থা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘পৃথিবীর সব সভ্য নগরীরই একটা পরিকল্পনা থাকে। সেখানে কত মানুষ বসবাস করবে, কতটুকু সবুজ থাকবে, কতটুকু জল থাকবে। সে হিসেবে ঢাকায় মানুষ কয়েক গুণ বেশি, কিন্তু গাছ ও জল একেবারেই সামান্য। এ সামান্যের মধ্যেই আছে রাজধানীর অভিজাত এলাকার লেকগুলো। কিন্তু সে লেকগুলো এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। লেকগুলো এমন তীব্রভাবে নষ্ট হয়েছে যে সে দূষণ আমাদের খাদ্য শৃঙ্খলে ঢুকে পড়ছে খুব সহজেই। হয়তো গ্রাউন্ড ওয়াটারের মাধ্যমে অথবা সরাসরি কিংবা অন্য কোনো উপায়ে। যেমন রাস্তার হকাররা এসব লেকের পানি ব্যবহার করেন। তাদের থেকে খাবার খেলে আমাদের দেহে কিন্তু বিষাক্ত পানি ঢুকে যাচ্ছে। তখন আমরা মারাত্মক সব রোগে আক্রান্ত হচ্ছি। এখানে মশা-মাছি জন্মে মৃত্যুঝুঁকি তৈরি করছে। দুর্গন্ধ আমাদের শ্বাসযন্ত্রকে দুর্বল করছে। শুধু তা-ই নয়, কোনো পাখি বা প্রাণী যদি এ লেকের পানি পান করে তাহলে ওই প্রাণী তো অসুস্থ হবেই, আশঙ্কা থাকে আমরাও তাদের মাধ্যমে অসুস্থ হতে পারি। তাই লেকগুলোকে অযত্নে ফেলে রাখা কেবল সৌন্দর্যের হানি এমন নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনা।’
ধানমন্ডি ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের কাছে সকাল কিংবা বিকালে হাঁটা ও বেড়ানোর জন্য লেকটি বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু কয়েক দশক ধরেই ধানমন্ডি লেক বাণিজ্যিক কার্যক্রমে শ্রী হারাচ্ছে। বারবার লেকটির মূল নকশা ভেঙে দোকান বাড়ানো এবং পার্কিংয়ের জন্য জায়গা বরাদ্দ দেয়া হয়। গত কয়েক বছর ধানমন্ডি লেকের রবীন্দ্র সরোবর এলাকাটি হয়ে উঠেছে মুখরোচক খাবারের জমজমাট কেন্দ্র। সেখানে নকশা অনুযায়ী চারটি ফুচকার ছোট দোকান থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে দোকানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০টির বেশি। এ দোকানগুলো তাদের নির্ধারিত সীমানা ছাড়িয়ে ফুটপাথ ও লেকের জায়গায়ও ছড়িয়ে পড়েছে। এসব দোকান থেকে প্রতিনিয়ত প্লাস্টিক ও সাধারণ বর্জ্য লেকে ফেলা হচ্ছে।
গতকাল ধানমন্ডি লেক এলাকায় সরজমিনে দেখা যায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই সেখানে পাঁচ দিনব্যাপী বৈশাখী মেলা হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, কোথাও নতুন করে কংক্রিটের আচ্ছাদন দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে পার্কিং।
অতিরিক্ত বাণিজ্যিক কার্যক্রমে ধানমন্ডি লেকের পরিবেশ নষ্ট হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম। তিনি বলেন, ‘এ লেকটি নষ্ট হয়েছে ব্যবহারকারীদের অসচেতনতার কারণেই। এখানে এত বেশি বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলছে, যা দেখে এটা যে স্বস্তির জায়গা তা বোঝার উপায় নেই। এভাবে তো লেক বাঁচানো যাবে না।’
ধানমন্ডি লেক বিষয়ে তার পরিকল্পনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি লেকটি পরিদর্শন করেছি। যারা ইজারা পেয়েছে, যতটুকু জায়গায় পেয়েছে, তার মধ্যে থাকতে পারলে ব্যবসা করবে, নয়তো তাদের বরাদ্দ বাতিল করা হবে। শুনেছি সেখানে এখন মেলা চলছে। আমরা তো মেলার অনুমতিও দিইনি। তাহলে কারা মেলা করছে? আমরা এখানে একটি কমিটি করে দেব। যাতে লেক রক্ষা পায়। শুধু মানুষ নয়, এ লেক তো মাছ-পাখির জন্যও। এটা ভুলে গেলে চলবে না।’
রাজধানীর আরেকটি বড় লেক হাতিরঝিল। এ লেকটিও এখন কালো পানি আর দুর্গন্ধের আধার। এখানে যারা হাঁটাচলা করেন এবং ওয়াটার ট্যাক্সিতে যাতায়াত করেন, তাদের চলতে হয় নাক চেপে।
২০২২ সালে হাতিরঝিলের দূষণ নিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) গবেষকরা একটি গবেষণা করেন। এতে হাতিরঝিলের পানিতে নানা ধরনের জীবাণুর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এতে আরো বলা হয়, হাতিরঝিলের পানি মানবস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। এ পানিতে জীবাণুর ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি। মূলত সুয়ারেজের দূষিত পানি মিশে যাচ্ছে বলেই অল্প পরিমাণ পানিতে প্রচুর পরিমাণে জীবাণু পাওয়া যাচ্ছে।
সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঢাকার লেকগুলো মশা-মাছির প্রজনন ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের এ অধ্যাপক বলেন, ‘এটা খুবই দুঃখজনক যে সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের আধার লেকগুলো এখন মশা-মাছি-ব্যাকটেরিয়ার প্রজননস্থলে পরিণত হয়েছে। লেকগুলো পরিষ্কার ও প্রবহমান রাখলে এ দুর্ভোগ তৈরি হতো না। তবে দায়িত্বরত সংস্থাগুলো যদি এখনো আন্তরিকতার সঙ্গে চায় তাহলে লেকগুলোর বাস্তুতন্ত্র ফিরিয়ে আনা সম্ভব। লেকগুলোতে উপযোগী মাছ যেমন গাপ্পি মাছ, ব্যাঙ ছাড়া যেতে পারে। তাহলে লেকগুলো মশা-মাছির প্রজননস্থল হবে না। লেকগুলো নষ্ট হয়েছে সুয়ারেজ বর্জ্যের মাধ্যমে। এখানে সরাসরি সুয়ারেজ বর্জ্য না ফেলে ট্রিটমেন্ট করে ফেললেই কিন্তু সমাধান হয়ে যায়। সমস্যা বড় হলেও সমাধান অযোগ্য নয়। অভাব শুধু আন্তরিক উদ্যোগের।’
সার্বিক বিষয় জানতে চাইলে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকার লেকগুলো নষ্ট হয়েছে সুয়ারেজ বর্জ্যের কারণে। গুলশান লেক ও হাতিরঝিল লেক সরাসরি রাজউক তত্ত্বাবধান করে। কিন্তু এখানে আশপাশের বাড়ি থেকে আসা সুয়ারেজ বর্জ্য ঠেকানো যাচ্ছে না। ঢাকা ওয়াসা মাত্র ২০ শতাংশ পয়ঃবর্জ্য সংযোগ নির্মাণ করতে পেরেছে। আবার দাশেরকান্দিতে ট্রিটমেন্ট প্লান্ট করেছে, সেখানে সংযোগ নেই। যে কারণে ঢাকার লেকগুলো বাঁচিয়ে রাখা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
সূত্র : বণিক বার্তা