যুগের পর যুগ ভাঙনের শিকার চৌহালীবাসী, আশ্বাস ছাড়া মেলেনি কোন প্রতিকার
চৌহালী (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি :
/ ২
বার দেখা হয়েছে
আপডেট :
বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬
শেয়ার করুন
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে গত কয়েকদিন ধরেই বৃদ্ধি পাচ্ছে সিরাজগঞ্জের যমুনার নদীর পানি প্লাবিত হচ্ছে নিম্নচল। তবে যমুনার ভয়াল গ্রাসে বারবার ক্ষতবিক্ষত হওয়া সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলায় আবারও দেখা দিয়েছে নদীভাঙনের আতঙ্ক। চর সলিমাবাদ, টেকপাড়া ও ভূতের মোড় এলাকায় যমুনার তীরসংরক্ষণ বাঁধে নতুন করে ধস দেখা দিয়েছে। এতে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন নদীতীরবর্তী হাজারো মানুষ।
সরজমিনে গিয়ে দেখা গিয়েছে, ভাঙনস্থল থেকে আর মাত্র কয়েক মিটার দূরত্বেই অবস্থিত টেকপাড়া পাকা মসজিদ, চর সলিমাবাদ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠ, কবরস্থান, স্থানীয় খেলার মাঠ, হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও বাজারসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এখন সরাসরি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। ভাঙনের তীব্রতা অব্যাহত থাকলে অল্প সময়ের মধ্যেই এসব স্থাপনা যমুনার গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সাথে সাথেই বাড়ে ভাঙ্গন, গত কয়েকদিনে চৌহালীর চর সলিমাবাদ, ভূতের মোড়, টেকপাড়া, স্থল ও উমারপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন চরাঞ্চলে ভাঙ্গনের কবলে পড়ে ঘরবাড়ি স্থান্তর করতে হয়েছে কয়েকশ’ ঘরবাড়ি। বিভিন্ন সময়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে জিওব্যাগ ডাম্পিং করা হলেও তা স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি। এক স্থানে ভাঙন রোধ করা গেলেও কিছুদিন পর অন্য স্থানে নতুন করে ভাঙন শুরু হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. মাসুম বিল্লাহ বলেন, “স্থায়ী বাঁধ না থাকায় প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে যমুনার পানি বাড়লেই এ অঞ্চলের মানুষ ভয়াবহ ভাঙনের শিকার হয়। নদী আমাদের ঘরবাড়ি, জমিজমা ও জীবিকার উৎস কেড়ে নিচ্ছে, অথচ স্থায়ী কোনো সমাধান নেই।” তিনি জানান, চলতি বছরে প্রায় ৫০টি বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। পাশাপাশি কয়েকশ বিঘা আবাদি জমি, বিভিন্ন শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বাজার এবং প্রায় দুই হাজার ঘরবাড়ি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসীর অভিযোগ, চৌহালীর মানুষের জীবন যেন যমুনার সঙ্গে এক অন্তহীন সংগ্রামের নাম। যুগের পর যুগ ধরে চলা এ ভাঙনে ইতোমধ্যে উপজেলার ৮৫ শতাংশেরও বেশি ভূমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। হারিয়ে গেছে বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার, ধর্মীয় স্থাপনা, ফসলি জমি ও হাজার হাজার পরিবারের বসতভিটা। অনেক পরিবার সাত থেকে দশ বার স্থানান্তর হতে বাধ্য হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান সাইমন বলেন, “চৌহালীর দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি, আমরা অস্থায়ী জিওব্যাগ ডাম্পিং নয়, স্থায়ী সমাধান চাই। প্রতিবছর ভাঙনের আতঙ্ক নিয়ে বাঁচতে বাঁচতে মানুষ এখন ক্লান্ত। যমুনা শুধুমাত্র মানুষের ঘরবাড়ি আর ফসলি জমি-ই কেড়ে নেন না, কেড়ে নেন মানুষের আস্থা, ভালোবাসা ও স্মৃতি। তিনি আরো বলেন, টেকপাড়া মসজিদ, ঈদগাহ, কবরস্থান ও খেলার মাঠ এখন সবচেয়ে হুমকির মুখে। আমরা চাই না আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মও একই দুর্ভোগের শিকার হোক। দ্রুত একটি টেকসই ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হোক।”
এলাকাবাসীর দাবি, যমুনা নদীর ভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর প্রকল্প গ্রহণ না করলে প্রতি বছরই নতুন নতুন এলাকা হুমকির মুখে পড়বে। তারা দ্রুত জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও জনপ্রতিনিধিদের কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
তবে, নদী ভাঙ্গন থেকে, চৌহালীর মানুষকে বাঁচাতে স্থানীয় এমপি মহাদয়, জবাব আমিরুল ইসলাম আলিম ইতিমধ্যেই জাতীয় সংসদে চৌহালী বাসীর দীর্ঘদিন প্রাণের দাবি, স্থায়ী সমাধান এর দাবি করে বক্তব্য পেশ করছেন। চৌহালী বাসী আবারো নতুন করে প্রহর গুনছে এবার হয়তো মিলতে পারে স্থায়ী বাঁধ।
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, “সিরাজগঞ্জের কয়েকটি উপজেলার যমুনার বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। বিষয়টি আমাদের নজরে আসার পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ও জিওটিউব ফেলার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে ভাঙন আরও বিস্তার লাভ না করে।”
তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বারবার অস্থায়ী প্রতিরোধ নয়—যমুনার ভাঙন থেকে চৌহালীকে রক্ষায় এবার একটি স্থায়ী ও টেকসই সমাধান বাস্তবায়ন করা হোক। কারণ তাদের মতে, ভাঙনের এই অবিরাম চক্র বন্ধ না হলে একদিন মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যেতে পারে চৌহালীর আরও বিস্তীর্ণ জনপদ।