রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ১২:২৮ অপরাহ্ন
সর্বশেষ
খাদ্যগ্রহণে ইসলামের পাঁচ নীতি আগামী পাঁচদিন সারা দেশে বাড়তে পারে বৃষ্টি/বজ্রসহ বৃষ্টির প্রবণতা শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটারদের সংগঠনের প্রধান কুসাল মেন্ডিস সন্ধ্যায় মাছ শিকারে বেরিয়েছিলেন, রাতে মিললো বুকে ছুরিবিদ্ধ মরদেহ দিনের বেলাতেই নামবে অন্ধকার, ১২১ বছর পর ১২ আগস্ট যে বিরল দৃশ্যের দেখা মিলবে ইউরোপে দেশের বাজারে স্বর্ণের ভরি কত? ২০২৩ সালে ইকুয়েডরে প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে হত্যায় সাতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ সূচকের ওঠানামায় পুঁজিবাজারে লেনদেন চলছে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই জানে না তাদের ওপর এআই নজর রাখছে, চালাচ্ছে হামলা বগুড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকে আরেক ট্রাকের ধাক্কা, নিহত ২
নোটিশ:
তথ্য ও প্রচার মন্ত্রণালয় নিবন্ধনকৃত অনলাইন নিউজ পোর্টাল দ্য পিপলস্ নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকে সারা দেশে জেলা প্রতিনিধি নিয়োগ করা হবে। মোবাইল: ০১৭১১-১১৬২৫৭, ০১৭১২-৪০৭২৮২ ' ই-মেইল : thepeopelesnews24@gmail.com

প্রযুক্তির যুগে সময়ের অপচয় ও সচেতনতা

অনলাইন ডেস্ক: / ১০ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৬

মহান আল্লাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিয়ামত হলো মানুষের জীবন ও সময়। সুন্দর এই পৃথিবীতে মহান আল্লাহ প্রতিটি মানুষকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রেরণ করেন।

জন্মের আগেই আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক মানুষের জীবনকাল নির্ধারণ করে রেখেছেন। এই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মানুষ তার জীবনযাপন করে, বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে এবং নানাবিধ কর্মের মাধ্যমে পৃথিবীতে নিজের অবস্থান তৈরি করে। কিন্তু এই সময়সীমা এক মুহূর্তও আগে-পরে বা কমবেশি হয় না। যার জন্য যতটুকু সময় নির্ধারিত রয়েছে, সেই সময় শেষ হয়ে গেলেই তার পার্থিব জীবনের অবসান ঘটে এবং সে পরকালের যাত্রায় পা রাখে।

তাই একজন মুমিন সর্বদা সচেতন থাকে যে তার জীবন সীমিত এবং প্রতিটি মুহূর্তই মূল্যবান। এই উপলব্ধি মানুষকে সৎকর্মে উৎসাহিত করে, পাপ থেকে দূরে রাখে এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যশীল হতে উদ্বুদ্ধ করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কিন্তু যখন কারো নির্ধারিত সময়কাল উপস্থিত হবে তখন আল্লাহ তাকে কিছুতেই অবকাশ দেবেন না। তোমরা যা কিছুই করো আল্লাহ সে সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত।

(সুরা : মুনাফিকুন, আয়াত : ১১)

জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের জবাবদিহি

পার্থিব জীবনে মানুষের জন্য যে নির্দিষ্ট সময়কাল নির্ধারণ করা হয়েছে, তার প্রতিটি মুহূর্তের জন্যই তাকে মহান আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। মানুষ পৃথিবীতে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করলেও তার প্রতিটি কাজ, কথা, চিন্তা ও সময়ের ব্যবহার আল্লাহর জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক মানুষকে জিজ্ঞাসা করবেন, সে তার জীবনকাল কিভাবে অতিবাহিত করেছে, আল্লাহর দেওয়া সুযোগ-সুবিধা কতটুকু সঠিকভাবে কাজে লাগিয়েছে এবং নিজের দায়িত্ব পালনে কতটুকু সচেষ্ট ছিল। মহান আল্লাহ সময়ের শপথ করে বলেন, ‘শপথ মহাকালের, মানুষ অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত; কিন্তু তারা নয়, যারা ঈমান আনে, সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয় ও ধৈর্যের উপদেশ দেয়।’ (সুরা : আসর, আয়াত : ১-৩)

আল্লাহর এই শপথ সময়ের অসীম মূল্য ও তাৎপর্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

সময়ের অপচয়ের জন্য পরকালে অনুশোচনা

ইসলাম মানুষের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে অর্থবহ ও কল্যাণকর কাজে ব্যয় করার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। পার্থিব জীবনে মানুষ প্রায়ই মনে করে যে তার হাতে অনেক সময় রয়েছে। ফলে সে ইবাদত, আল্লাহর স্মরণ, নেক আমল, জ্ঞানার্জন ও মানবকল্যাণমূলক কাজকে পিছিয়ে দেয়। কিন্তু যখন আখিরাতের বাস্তবতা তার সামনে উন্মোচিত হবে এবং সে তার আমলনামা প্রত্যক্ষ করবে, তখন উপলব্ধি করবে যে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কত অমূল্য ছিল। তখন সে দেখবে, যে সময়গুলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের কাজে ব্যয় করা হয়েছে সেগুলোই তার জন্য কল্যাণ ও সফলতার পাথেয়, আর যে সময়গুলো বৃথা নষ্ট হয়েছে সেগুলোই তার অনুশোচনার কারণ।

এ প্রসঙ্গে মুআজ ইবনু জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জান্নাতবাসীরা পৃথিবীর কোনো কিছুর জন্য আফসোস করবে না; তবে তারা আফসোস করবে শুধু সেই সময়ের জন্য, যা তারা আল্লাহর স্মরণ ছাড়া অতিবাহিত করেছে।’ (আল-মুজামুল কাবির, হাদিস : ১৮২; শুআবুল ঈমান, হাদিস : ১০৫৭)

সময়ের ব্যাপারে মুমিনের বৈশিষ্ট্য

মুমিনের জীবন কখনোই উদ্দেশ্যহীন, অর্থহীন কিংবা অনর্থক কর্মকাণ্ডে পরিপূর্ণ হতে পারে না। কারণ সে জানে, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর দেওয়া এক মূল্যবান আমানত এবং এর প্রতিটি অংশের হিসাব একদিন মহান রবের দরবারে দিতে হবে। তাই ঈমানদার ব্যক্তি সর্বদা এমন কথা ও কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখে, যা দুনিয়া ও আখিরাতের কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না। মহান আল্লাহ মুমিনদের সফলতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘অবশ্যই সফল হয়েছে মুমিনরা; যারা তাদের সালাতে বিনয়ী ও একাগ্র থাকে এবং যারা অসার ও অনর্থক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকে।’

(সুরা : আল-মুমিনুন, আয়াত : ১-৩)

মহান আল্লাহ অন্যত্র তাঁর নেককার বান্দাদের গুণাবলি বর্ণনা করে বলেন, ‘আর তারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না এবং যখন তারা অসার কর্মকাণ্ডের সম্মুখীন হয়, তখন মর্যাদার সঙ্গে তা পরিহার করে চলে।’

(সুরা : আল-ফুরকান, আয়াত : ৭২)

এ প্রসঙ্গে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কোনো ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্য ও উৎকর্ষের অন্যতম নিদর্শন হলো, সে অনর্থক ও অপ্রয়োজনীয় বিষয় পরিহার করে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩১৭; ইবনু মাজাহ, হাদিস : ৩৯৭৬)

প্রযুক্তির যুগে সময়ের অপচয় ও সচেতনতার শিক্ষা

মানুষের জীবনকে সহজ, সুন্দর ও গতিশীল করার জন্য প্রতিনিয়ত আবিষ্কৃত হচ্ছে নতুন নতুন প্রযুক্তি ও আধুনিক যন্ত্রপাতি। এসব প্রযুক্তির মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের শ্রম কমানো, কাজের গতি বৃদ্ধি করা এবং মূল্যবান সময় সাশ্রয় করা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, যে প্রযুক্তি আমাদের সময় বাঁচানোর জন্য সৃষ্টি হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই সেই প্রযুক্তির মাধ্যমেই অজান্তে জীবনের অমূল্য সময় অপচয় হয়। বিশেষ করে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আজকের তরুণসমাজের জীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে। প্রয়োজনীয় যোগাযোগ, শিক্ষা ও তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে এগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অসংখ্য মানুষ দিনের পর দিন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল ফোনের পর্দায় ডুবে থেকে মূল্যবান সময় নষ্ট করছে। কোনো প্রয়োজন নেই, তবু অবিরাম স্ক্রল করে চলেছে; এক ভিডিও থেকে আরেক ভিডিও, এক পোস্ট থেকে আরেক পোস্টে ছুটে বেড়াচ্ছে। অনেকের অবস্থা এমন যে চলার পথে, যানবাহনে, এমনকি পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশেও তারা মোবাইল ফোন ও হেডফোনের জগতে বন্দি হয়ে থাকে। ফলে সময়ের পাশাপাশি মনোযোগ, চিন্তাশক্তি এবং পারিবারিক বন্ধনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) সময়ের মূল্য সম্পর্কে উম্মতকে গভীরভাবে সচেতন করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে বেশির ভাগ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত—সুস্থতা ও অবসর সময়।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪১২)

সময়ের মূল্যায়নের এক অনন্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় সাহাবায়ে কেরামের জীবন থেকে। বদর যুদ্ধের প্রাক্কালে রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের উদ্দেশে বললেন, ‘তোমরা এমন জান্নাতের দিকে এগিয়ে চলো, যার বিস্তৃতি আকাশ ও পৃথিবীর চেয়েও ব্যাপক।’ তখন উমাইর ইবনু হামাম (রা.) বিস্ময় ও আনন্দে বলে উঠলেন, বাহ! বাহ! রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কেন এ কথা বললে?’ তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি আশা করি, আমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত হব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তুমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত।’ তখন উমাইর (রা.) তাঁর থলি থেকে কিছু খেজুর বের করে খেতে শুরু করলেন। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলেন, এই খেজুরগুলো শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করাও তো দীর্ঘ সময়! এরপর তিনি খেজুরগুলো ফেলে দিয়ে তরবারি হাতে যুদ্ধক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করলেন। (মুসলিম, হাদিস : ১৯০১)

পরিশেষে বলা যায়, মানুষের জীবন সংক্ষিপ্ত, কিন্তু এর গুরুত্ব অপরিসীম। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত একটি আমানত, যার সঠিক ব্যবহারই মানুষের প্রকৃত সফলতার চাবিকাঠি। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত সময়ের গুরুত্ব উপলব্ধি করা, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে কল্যাণকর কাজে নিয়োজিত করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সচেষ্ট থাকা।

লেখক : অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর