বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির অর্থ পরিশোধে বিশ্বব্যাংকের আরও ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের গ্যারান্টি সুবিধা আগামী নভেম্বরে কার্যকর হতে পারে। নতুন এ সুবিধা যুক্ত হলে এলএনজি আমদানির জন্য গ্যারান্টি সুবিধার মোট পরিমাণ দাঁড়াবে ৭০০ মিলিয়ন ডলার। এতে বাড়তি গ্যাসের চাহিদা পূরণে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত অর্থায়ন সুবিধা যুক্ত করতে বিদ্যমান চুক্তিগুলো সংশোধনের কাজ চলছে। আগস্টের মধ্যেই সংশোধন ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এরপর পেট্রোবাংলার বোর্ডের অনুমোদন, জ্বালানি বিভাগের ছাড়পত্র এবং আইন মন্ত্রণালয়ের আইনগত যাচাই শেষে সংশোধিত চুক্তি সই করা হবে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) আগামী অক্টোবর মাসে প্রস্তাবটি বিশ্বব্যাংকের বোর্ডে উপস্থাপন করতে পারে। সব প্রক্রিয়া শেষ হলে নভেম্বরে নতুন সুবিধা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান বলেন, বর্তমানে ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন কাঠামো রয়েছে। সেটি বাড়িয়ে ৭০০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য চারটি চুক্তি সংশোধন বা পুনর্লিখন করতে হবে।
তিনি জানান, কয়েকটি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও পেট্রোবাংলার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি বিশ্বব্যাংক এবং সিঙ্গাপুরভিত্তিক তিনটি ব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত একটি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছে।
২০২৫ সালের ১৮ জুন এনার্জি সেক্টর সিকিউরিটি এনহ্যান্সমেন্ট প্রকল্পের আওতায় বিশ্বব্যাংক বিদ্যমান ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের সুবিধাটি অনুমোদন করে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে প্রকল্পটি কার্যকর হয়। প্রকল্পটির মেয়াদ ২০৩১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
ঋণ নয়, গ্যারান্টিভিত্তিক অর্থায়ন
প্রস্তাবিত ৭০০ মিলিয়ন ডলারের পুরো সুবিধাটি প্রচলিত অর্থে ঋণ নয়। এটি একটি নন-ফান্ডেড বা কনটিনজেন্ট অর্থায়ন ব্যবস্থা, যার মূল লক্ষ্য এলএনজি আমদানির অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তা দেওয়া।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, ৬৫০ মিলিয়ন ডলার স্ট্যান্ডবাই লেটার অব ক্রেডিট (এসবিএলসি) হিসেবে এলএনজি আমদানির অর্থ পরিশোধে ব্যবহার করা যাবে। বাকি ৫০ মিলিয়ন ডলার থাকবে ক্রেডিট সাপোর্ট লাইন হিসেবে। প্রয়োজন হলে এই অর্থ ব্যবহার করতে পারবে পেট্রোবাংলা।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন সুবিধা ব্যবহারের জন্য পেট্রোবাংলাকে আগামী নভেম্বরের মধ্যে এসবিএলসি ইস্যু করতে হবে।
বর্তমানে চালু থাকা ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের সুবিধাতেও একই ধরনের কাঠামো রয়েছে। এর মধ্যে ৫০ মিলিয়ন ডলার ক্রেডিট লাইন হিসেবে রাখা হয়েছে, যা এখনো ব্যবহার করা হয়নি। বাকি ৩০০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে ২৫০ মিলিয়ন ডলার দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির অর্থ পরিশোধ এবং ৫০ মিলিয়ন ডলার স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার জন্য নির্ধারিত।
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির জন্য বরাদ্দ ২৫০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে পেট্রোবাংলা ইতোমধ্যে প্রায় ২৩৫ মিলিয়ন ডলার ব্যবহার করেছে। অন্যদিকে, স্পট মার্কেটের জন্য নির্ধারিত ৫০ মিলিয়ন ডলারের সুবিধা দুইবার ব্যবহার করা হয়েছে। তৃতীয়বার তা ব্যবহারের প্রস্তুতি চলছে।
এ অর্থায়ন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, কোনো অর্থ পরিশোধ সম্পন্ন হলে সংশ্লিষ্ট সুবিধা আবার ব্যবহার করা যায়। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী পেট্রোবাংলা একই অর্থায়ন কাঠামো পুনরায় কাজে লাগাতে পারবে।
বাড়ছে এলএনজি নির্ভরতা
দেশে অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে এলএনজির ওপর নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ ১৪ হাজার টন এলএনজি আমদানি করেছে। এসব এলএনজি এসেছে ৫৯৭টি কার্গোর মাধ্যমে।
বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি আমদানি করে। দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারীদের মধ্যে কাতারএনার্জি ও ওমানের ওকিউ ট্রেডিং রয়েছে। অতিরিক্ত চাহিদা মেটাতে স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি কেনে পেট্রোবাংলা।
এলএনজি আমদানির ব্যয় আন্তর্জাতিক বাজারের দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। ২০২৫ সালে দেশে এলএনজি আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন আরও কমে গেলে ভবিষ্যতে আমদানির প্রয়োজন বাড়তে পারে।
পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, ২০৪১ সালে বাংলাদেশের বছরে প্রায় ৩ কোটি টন এলএনজির প্রয়োজন হতে পারে। সে সময় দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৮০০ কোটি ঘনফুটে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত এবং বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা এলএনজির সরবরাহ ও দামের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে পেট্রোবাংলাকে স্পট মার্কেট থেকে অতিরিক্ত এলএনজি কিনতে হতে পারে। এতে আমদানি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংকের গ্যারান্টি সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ এলএনজি আমদানির অর্থ পরিশোধে পেট্রোবাংলাকে অতিরিক্ত আর্থিক সক্ষমতা দেবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন।
তথ্যসূত্র : দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।