বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:২০ পূর্বাহ্ন
নোটিশ:
তথ্য ও প্রচার মন্ত্রণালয় নিবন্ধনকৃত অনলাইন নিউজ পোর্টাল দ্য পিপলস্ নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকে সারা দেশে জেলা প্রতিনিধি নিয়োগ করা হবে। মোবাইল: ০১৭১১-১১৬২৫৭, ০১৭১২-৪০৭২৮২ ' ই-মেইল : thepeopelesnews24@gmail.com

তালাক দেওয়ার আগে একটু ভাবুন

অনলাইন ডেস্ক: / ১৩ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
-প্রতীকী ছবি।

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো শয়তানের কাছে সবচেয়ে প্রিয় কাজ। আর তার সৈন্য ও সহযোগীদের মধ্যে যে ব্যক্তি এটি ঘটাতে সক্ষম হয়, সে শয়তানের কাছে সবচেয়ে প্রিয় ও নিকটবর্তী হয়ে যায়। তাই একজন মুমিনের উচিত নিজের পরিবারে এমন কোনো বিষয় থেকে সতর্ক থাকা, যা ফিতনা সৃষ্টি করে এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিরোধ তৈরি করে। কারণ এর পরিণতি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঝগড়া-বিবাদ, কলহ, অতঃপর তালাক ও বিচ্ছেদ। এর মাধ্যমে একটি পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় এবং এমন সব সমস্যার সূচনা হয়, যার সমাধান কখনো কঠিন, এমনকি কখনো অসম্ভবও হয়ে পড়ে।

তালাকের তিক্ত ফল শুধু একজন পুরুষ ও একজন নারীর বিচ্ছেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা তাদের সন্তানদের জীবনেও গভীর আঘাত হানে। পিতা-মাতার জীবনের এই বিপজ্জনক মোড় তাদের সন্তানদের ওপর প্রচণ্ড প্রভাব ফেলে। এর ফলে তাদের মনমানসিকতা পরিবর্তিত হয়, হৃদয় দুঃখে জর্জরিত হয় এবং প্রশান্তি হারিয়ে যায়। কখনো কখনো এর পথ ধরে মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়া হয়, সাক্ষ্য-প্রমাণ চাওয়া হয়।

কখনো ব্যক্তিগত প্রবৃত্তি ও পক্ষপাতিত্ব পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং উভয় পক্ষ একে অপরের ওপর জুলুম, অপবাদ ও মিথ্যা অভিযোগ করতে থাকে। এমনকি বাস্তবতার বিরোধী মিথ্যা সাক্ষ্যও দেওয়া হয়। কারণ এসব কাজ সত্যকে প্রতিষ্ঠা ও প্রকাশ করার জন্য হয় না; বরং পক্ষপাত, গোত্রীয় বা পারিবারিক অহংকার ও অন্ধ আবেগ মানুষকে এসবের দিকে ঠেলে দেয়। আর এটাই শয়তান চায়, এটাই তার কামনা, এটাই তার প্রিয় এবং সে নিজে ও তার সৈন্যরা মানুষকে এর দিকেই পরিচালিত করে।

যদি পবিত্র ও উত্তম হৃদয়ের মানুষ ক্ষমা ও উপকার করার মধ্যে আনন্দ অনুভব করে, তবে নষ্ট হৃদয়ের মানুষ অন্যায় ও আক্রমণাত্মক আচরণে আনন্দ পায়। আর কোনো কাজই পূর্ণ ঈমান, বিবেক, মানবিক মর্যাদা ও বিশ্বস্ততার এত বড় প্রমাণ নয়- যতটা একজন পুরুষের নিজের ঘরের স্ত্রীর প্রতি সদাচরণ। স্ত্রী তো সেই, যাকে তার স্বামী পরিবারের কাছ থেকে আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং আল্লাহর বাণীর মাধ্যমে তার সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক বৈধ করেছে। সে তার অধীনে ও তার সংসারে নির্ভরশীল। তার জীবনের সাধারণ বিষয়গুলোর দায়িত্বও স্বামীর ওপর অর্পিত। আর সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে কল্যাণকামী মানুষ মহানবী (সা.) বিদায় হজের ভাষণে বিশাল জনসমাবেশের সামনে নারীদের ব্যাপারে বিশেষভাবে নির্দেশ দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, ‘তোমরা নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। কারণ তোমরা তাদের আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ এবং আল্লাহর বাণীর মাধ্যমে তাদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক বৈধ করেছ। তোমাদের ওপর তাদের অধিকার হলো তারা যেন এমন কাউকে তোমাদের শয্যায় প্রবেশ করতে না দেয়, যাকে তোমরা অপছন্দ করো। তারা যদি তা করে, তবে এমনভাবে শাস্তি দেবে, যা কষ্টদায়ক নয়। আর তাদের খাদ্য ও পোশাকের ব্যবস্থা তোমাদের ওপর রয়েছে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১৯০৫)।

আল্লাহ তাআলা বিবাহের বন্ধনকে পবিত্র কোরআনে ‘মিসাকান গালিজা’ একটি দৃঢ় ও গুরুতর অঙ্গীকার বলে অভিহিত করেছেন। তাহলে একজন মুমিন কিভাবে এই দৃঢ় অঙ্গীকারকে নিজের কাছে এত তুচ্ছ ও দুর্বল করে ফেলতে পারে যে ‘তালাক’ শব্দটি তার মুখের নিত্যদিনের বুলি হয়ে যায়? সে প্রতিটি মুহূর্তে এই শব্দ দিয়ে স্ত্রীকে হুমকি দেয়, ভয় দেখায়, রাগের সময় তা উচ্চারণ করে এবং ছোট-বড় প্রতিটি বিষয়ে তালাকের শপথ করে!

কিছু স্বল্প বুদ্ধির মানুষ তো তালাকের শপথকে নিজেদের জিহ্বার অভ্যাসে পরিণত করেছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হোক বা তুচ্ছ বিষয়- সব ক্ষেত্রেই তারা তালাকের কথা বলে। বড় বিষয় হোক বা ছোট বিষয়-সবকিছুতেই তালাকের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চায়। স্ত্রীকে প্রতিনিয়ত তালাকের হুমকি দেয়। অথচ এমনও হতে পারে যে তার উচ্চারিত কথার কারণে সে না জেনেই নিজের স্ত্রীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম করে ফেলেছে। তার পরও সে তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে থাকে। ফলে তার সন্তানদের বংশপরিচয় ও বৈধতা নিয়ে সন্দেহের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন।

অতএব, আমরা আল্লাহকে ভয় করি। আমাদের জীবনের কাজকর্মকে শরিয়ত ও বিবেকের মানদণ্ডে যাচাই করি। প্রত্যেকেই যেন নিজের সংসারের স্থিতিশীলতা, পরিবারের শান্তি এবং নিজের ওপর নির্ভরশীলদের কল্যাণ ও সুশৃঙ্খল জীবন নিশ্চিত করার ব্যাপারে যত্নবান হই।

তাড়াহুড়া ও বেপরোয়া আচরণ থেকে সাবধান হই। জিন ও মানুষের শয়তানদের প্ররোচনায় যেন আমরা এমন কোনো উত্তেজিত কথা বলে না ফেলি, যা মুখ থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের বিচারক, আলেম ও মুফতিদের কাছে ছুটতে বাধ্য করে। এরপর নিজের কাজের জন্য নানা অজুহাত খুঁজতে হয় এবং এমন ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে হয়, যার মাধ্যমে নিজের বোকামি ও হঠকারিতাকে বৈধ প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়। হয়তো এর মাধ্যমে তার দায়মুক্তিও হবে না; বরং পরবর্তী সময়ে সে আরো সংকটের মধ্যে পড়বে। অথচ সে নিরাপদেই থাকতে পারত যদি সে নিজের জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করত, ধৈর্য ধরত, সহ্য করত, নিজেকে সংযত রাখত, রাগ ও রাগের কারণগুলো থেকে দূরে থাকত এবং রাগের মুহূর্তে নিজের আত্মমর্যাদা বা অহংকারের বিজয়কে জীবনের প্রধান লক্ষ্য না বানাত।

জানা উচিত, প্রকৃত শক্তি ও পূর্ণ সাহস কোনো দুর্বল নারীর ওপর কঠোরতা প্রদর্শনের মধ্যে নয়; বরং প্রকৃত শক্তি হলো নিজের প্রবৃত্তি ও আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা, সেগুলোকে সংযত রাখা এবং কোনো কাজের পরিণতি ও ভবিষ্যৎ ফলাফল বিবেচনা করা। একই সঙ্গে সেই চিরশত্রু শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করতে পারে; বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬১১৪)।

আর যে ব্যক্তি মনে করে যে কঠোরতা ও শক্তি প্রয়োগ ছাড়া কোনো বিষয় পরিচালনা করা যায় না, সে নিজের জীবনকে কঠিন করে ফেলেছে এবং নিজের সুখ-শান্তিকে নষ্ট করেছে। সে তার জীবনকে টানাপড়েন, দুশ্চিন্তা ও অশান্তির ময়দানে পরিণত করেছে।

অন্যদিকে, যে ব্যক্তি কোমলতা ও নম্রতার অভ্যাস করেছে এবং মানুষের সঙ্গে কোমল আচরণ করেছে, সে স্বস্তি, সুখ, প্রশান্তি ও স্থিতিশীলতা লাভ করেছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘কোনো বিষয়ে কোমলতা থাকলে তা তাকে সুন্দর করে তোলে; আর কোনো বিষয় থেকে কোমলতা সরিয়ে নেওয়া হলে তা তাকে কুৎসিত করে দেয়।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২৪৭৮)।

কখনো এমনও হয় যে শয়তান কোনো পুরুষের মনে কঠোরতার প্ররোচনা দেয় এবং তাকে নিজের শক্তি ও কঠোরতা সম্পর্কে অহংকারে ফেলে। সে তাকে বোঝায় যে সে শক্তিশালী ও সাহসী। ফলে সে নিজের স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেয়। এরপর সন্তানরা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়, তাদের জীবন সম্পূর্ণ বদলে যায়। এমনকি তাদের আত্মীয়-স্বজনসহ মানুষও তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। সন্তানরা তখন দিশাহারা হয়ে পড়ে- না তারা বাবার কাছে স্বস্তি পায়, না মায়ের কাছে। তারা অসহায় হয়ে পড়ে, কষ্ট পায় এবং কখনো খাদ্য ও নিরাপত্তার সংকটেও পড়ে।

আবার কখনো স্ত্রীর পরিবার দরিদ্র হওয়ায় তার জন্য নতুন করে সংসার করার সুযোগও কমে যায়, বিশেষ করে যখন তার সন্তান রয়েছে। ফলে পৃথিবী তার জন্য প্রশস্ত হয়েও সংকীর্ণ হয়ে যায়। সে মানুষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং দুশ্চিন্তা, দুঃখ, একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতার মধ্যে জীবন কাটাতে থাকে। এটি তার জন্য ক্ষতির কারণ এবং কখনো তার ওপর জুলুমও হতে পারে। অতএব, সাবধান হোন! ধৈর্য ধরুন!! সদাচরণ করুন!!!

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সঙ্গে সদ্ভাবে জীবন যাপন করো। যদি তাদের অপছন্দ করো, তবে এমন হতে পারে যে তোমরা কোনো কিছুকে অপছন্দ করছ অথচ আল্লাহ তাতে অনেক কল্যাণ রেখেছেন।’ (সুরা : আন-নিসা, আয়াত : ১৯)।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর