শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৭ পূর্বাহ্ন
নোটিশ:
তথ্য ও প্রচার মন্ত্রণালয় নিবন্ধনকৃত অনলাইন নিউজ পোর্টাল দ্য পিপলস্ নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকে সারা দেশে জেলা প্রতিনিধি নিয়োগ করা হবে। মোবাইল: ০১৭১১-১১৬২৫৭, ০১৭১২-৪০৭২৮২ ' ই-মেইল : thepeopelesnews24@gmail.com

রসুলুল্লাহ (সা.)-এর রাষ্ট্রীয় জীবন

অনলাইন ডেস্ক: / ১২ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মানবজাতির দীর্ঘ ইতিহাসে বহু শাসক এসেছেন, বহু রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে, আবার সময়ের স্রোতে হারিয়েও গেছে। কিন্তু এমন নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত বিরল, যেখানে একজন মানুষ একই সঙ্গে ছিলেন আল্লাহর রসুল, আদর্শ শিক্ষক, সর্বশ্রেষ্ঠ সমাজ সংস্কারক, ন্যায়বিচারক, দক্ষ সেনাপতি, বিচক্ষণ কূটনীতিক ও মহান রাষ্ট্রনায়ক। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মদিনার জীবন সেই বিরল ইতিহাসের উজ্জ্বল অধ্যায়।

মক্কায় ১৩ বছর ইমান ও তাওহিদের দাওয়াত দেওয়ার পর ৬২২ খ্রিস্টাব্দে রসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করেন। হিজরত শুধু ভূখণ্ড পরিবর্তন ছিল না; বরং এটি ছিল একটি আদর্শ সমাজ ও সুসংগঠিত জনজীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা। মদিনায় পৌঁছে তিনি প্রথমে মসজিদ নির্মাণ করেন। সেই মসজিদ ছিল ইবাদতের পাশাপাশি শিক্ষা, পরামর্শ, সামাজিক কর্মকাণ্ড ও জনকল্যাণের প্রাণকেন্দ্র। এরপর তিনি মক্কা থেকে আগত মুহাজির ও মদিনার আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন প্রতিষ্ঠা করেন।

আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই।’ (সুরা আল-হুজুরাত : ১০)।

এই ভ্রাতৃত্ব শুধু আবেগের বিষয় ছিল না; এর মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছিল সহযোগিতা, সম্প্রীতি ও সামাজিক সংহতির অনন্য দৃষ্টান্ত।

মদিনার বহুগোষ্ঠীর সমাজকে সুসংগঠিত করতে রসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণ করে একটি লিখিত চুক্তি প্রণয়ন করেন, যা ইতিহাসে ‘মদিনা সনদ’ নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে পারস্পরিক নিরাপত্তা, দায়িত্ব ও সামাজিক শান্তির একটি কাঠামো গড়ে ওঠে। বহুধর্মী ও বহুগোষ্ঠীয় সমাজে সহাবস্থানের ক্ষেত্রে এটি ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।

রসুলুল্লাহ (সা.)-এর রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে ছিল ন্যায়বিচার। কোরআন ঘোষণা করেছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, তোমরা আমানত তাঁর হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও এবং মানুষের মধ্যে বিচার করলে ন্যায়ের সঙ্গে বিচার করো।’ (সুরা আন-নিসা : ৫৮)।

আইনের দৃষ্টিতে ধনী-দরিদ্র, আত্মীয়-অনাত্মীয় কিংবা ক্ষমতাবান-দুর্বল-কারও জন্য ছিল না পৃথক মানদণ্ড। বনু মাখজুমের এক সম্ভ্রান্ত নারী চুরির অপরাধে অভিযুক্ত হলে তাঁর জন্য সুপারিশ করা হয়।

তখন রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করত, আমি তাঁর হাত কেটে দিতাম।’ (সহিহ বুখারি)। এর মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করে দেন- ন্যায়বিচারের সামনে পরিচয় বা প্রভাবের কোনো মূল্য নেই। তাঁর নেতৃত্বে শুরা বা পরামর্শ ছিল গুরুত্বপূর্ণ নীতি।

আল্লাহ বলেন, ‘তাদের কার‌্যাবলি পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।’ (সুরা আশ-শুরা : ৩৮)।

বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে সাহাবিদের সঙ্গে তাঁর পরামর্শ, প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণ নেতৃত্বের অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও তিনি ন্যায়, সততা ও আমানতদারির সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করেন। জাকাতের ব্যবস্থা, সুদ নিষিদ্ধকরণ, প্রতারণা, ঘুষ, চুরি, আত্মসাৎ, অবৈধভাবে সম্পদ গচ্ছিত ও পাচার এবং অন্যায় উপার্জনের নিষেধাজ্ঞা-সবকিছুর লক্ষ্য ছিল সম্পদের সুষম প্রবাহ ও একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠন। বিশেষত রাষ্ট্রীয় ও জনসম্পদকে আমানত হিসেবে সংরক্ষণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে তা আত্মসাৎ থেকে বিরত থাকা তাঁর অর্থনৈতিক নীতির গুরুত্বপূর্ণ দিক। তিনি ঘোষণা করেন, ‘যে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম)।

রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর কূটনৈতিক দূরদর্শিতার অনন্য উদাহরণ হুদাইবিয়ার সন্ধি। আপাতদৃষ্টিতে কঠিন কিছু শর্ত মেনে নিয়েও তিনি বৃহত্তর শান্তি ও ভবিষ্যৎ কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেন। কোরআন এ ঘটনাকে ‘সুস্পষ্ট বিজয়’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। (সুরা আল-ফাতহ : ১)

নারী, এতিম, বিধবা, দরিদ্র ও সমাজের দুর্বল শ্রেণির অধিকার প্রতিষ্ঠায়ও তিনি ছিলেন অগ্রদূত। কোরআন ঘোষণা করেছে, ‘আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত সে-ই, যে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক তাকওয়াবান।’ (সুরা আল-হুজুরাত : ১৩)।

বংশ, গোত্র, সম্পদ কিংবা ক্ষমতা নয়-তাকওয়াই মর্যাদার প্রকৃত মানদণ্ড। তাঁর নেতৃত্বের সর্বোচ্চ সৌন্দর্য প্রকাশ পেয়েছিল মক্কা বিজয়ের দিনে। দীর্ঘ নির্যাতন ও প্রতিকূলতার পর বিজয়ী হয়েও তিনি প্রতিশোধের পথ বেছে নেননি; বরং ক্ষমা ও মহানুভবতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ক্ষমতার চূড়ায় থেকেও প্রতিহিংসামুক্ত থাকা তাঁর নেতৃত্বকে ইতিহাসে অনন্য মর্যাদা দিয়েছে। রসুলুল্লাহ (সা.)-এর রাষ্ট্রজীবনের সাফল্যের রহস্য তাই কেবল রাজনৈতিক কৌশল কিংবা সামরিক শক্তিতে নয়; এর ভিত্তিতে ছিল তাওহিদ, ন্যায়বিচার, আমানতদারি, পরামর্শ, মানবিকতা, চুক্তির প্রতি সম্মান ও জনকল্যাণের অঙ্গীকার।

আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।’ (সুরা আল-কলম : ৪)।

লেখক : গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার, বসুন্ধরা, ঢাকা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর