ইউক্রেনের হাতে আটক দুই উত্তর কোরীয় যুদ্ধবন্দীকে দক্ষিণ কোরিয়ায় পাঠানোর তথ্য প্রকাশ করায় কিয়েভের কাছে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা ও ব্যাখ্যা দাবি করেছে সিউল।
দক্ষিণ কোরিয়ার অভিযোগ, দুই দেশের মধ্যে বিষয়টি গোপন রাখার বিষয়ে সমঝোতা থাকার পরও ইউক্রেন একতরফাভাবে তা প্রকাশ করেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের জনসংযোগবিষয়ক জ্যেষ্ঠ সচিব সিয়ং গি-হং রবিবার এক বিবৃতিতে বলেন, ইউক্রেনের এমন পদক্ষেপে প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ‘গভীরভাবে দুঃখিত’। একই সঙ্গে গোপনীয়তা বজায় রাখার বিষয়ে কোনও সমঝোতা ছিল না- কিয়েভ পরবর্তী সময়ে এমন দাবি করায়ও সিউল আপত্তি জানিয়েছে।
সিয়ং বলেন, বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমে ইউক্রেন বারবার দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ওই দুই যুদ্ধবন্দীকে হস্তান্তরের বিষয়টি আলোচনা করেছে এবং বিষয়টি গোপন রাখার অনুরোধও জানিয়েছিল।
তবে ইউক্রেনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ বিষয়ে কোনও গোপনীয়তা চুক্তি ছিল না।
কী ঘটেছিল?
গত সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সময় আটক দুই উত্তর কোরীয় সেনাকে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে হস্তান্তর করেছে কিয়েভ।
রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে যুদ্ধের সময় ওই দুই সেনাকে আটক করা হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে ইউক্রেন রাশিয়ার সীমান্তবর্তী কুরস্ক অঞ্চলের বড় একটি অংশ দখলে নিয়েছিল। পরে অবশ্য সেই ভূখণ্ডের বেশির ভাগই রাশিয়া পুনর্দখল করে।
জেলেনস্কি তার ভাষণে বলেন, ওই দুই সেনাকে জীবিত আটক করা সহজ ছিল না। তাদের একজন বন্দী হতে যাচ্ছেন বুঝতে পেরে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন বলেও জানান তিনি।
রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার সেনা পাঠানোরও সমালোচনা করেন জেলেনস্কি। তিনি বলেন, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন তার দেশের সেনাদের ‘মুদ্রার মতো’ ব্যবহার করছেন এবং বিনিময়ে রাশিয়ার কাছ থেকে কিছু পাচ্ছেন।
জেলেনস্কি তখন আরও বলেছিলেন, রাশিয়ার হাতে আটক ইউক্রেনীয়দের সঙ্গে বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হলে তিনি দুই উত্তর কোরীয় সেনাকে কিমের কাছে ফিরিয়ে দিতে প্রস্তুত।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো ওই সেনাদের দক্ষিণ কোরিয়ায় পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল, উত্তর কোরিয়ায় ফেরত পাঠানো হলে ওই সেনারা শাস্তির মুখে পড়তে পারেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদমাধ্যমও জানিয়েছিল, আটক দুই সেনা সিউলে পালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।
ইউক্রেন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তাদের আটক করে। তারা ছিলেন ২০২৪ সালে রাশিয়ার যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার সরাসরি অংশগ্রহণ শুরুর পর জীবিত আটক হওয়া প্রথম উত্তর কোরীয় সেনা।
রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির অংশ হিসেবে পিয়ংইয়ং রাশিয়াকে সহায়তা করতে হাজার হাজার সেনা পাঠিয়েছে বলে বিভিন্ন হিসাব রয়েছে।
কেন ক্ষুব্ধ দক্ষিণ কোরিয়া?
দক্ষিণ কোরিয়া এর আগে ওই দুই সেনা দেশে পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। কারণ, তাদের নিরাপত্তার পাশাপাশি উত্তর কোরিয়ায় থাকা তাদের পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ ছিল সিউলের।
কিন্তু জেলেনস্কি আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিষয়টি প্রকাশ করে দেওয়ায় দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার বিস্মিত হয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, উত্তর কোরীয় যুদ্ধবন্দীদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টি ‘অত্যন্ত সংবেদনশীল এজেন্ডা’।
তিনি বলেন, আন্তঃকোরীয় সম্পর্ক, মানুষের জীবন কিংবা জাতীয় স্বার্থের ওপর এর প্রভাব বিবেচনা না করে যারা সাফল্য প্রদর্শনের জন্য পুরো বিশ্বের সামনে এই প্রত্যাবাসনের বিষয়টি ব্যাপক প্রচারের সঙ্গে প্রকাশ করেছেন, তারা হয়তো দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের বিষয়টি গোপন রাখার প্রচেষ্টার গুরুত্ব বুঝতে পারেননি।
লি আরও বলেন, “গোপনীয়তা চুক্তি লঙ্ঘন করে ইউক্রেন কেন বিষয়টি প্রকাশ করেছে, তার কারণ আমি জানি না। তবে বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।”
রবিবার সিয়ং গি-হংয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, পর্যাপ্ত পূর্বপরামর্শ ছাড়াই জেলেনস্কি ওই দুই সেনার প্রত্যাবাসনের তথ্য প্রকাশ করেছেন। পরে তিনি কোনও গোপনীয়তা চুক্তি ছিল না বলে দাবি করেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের মতে, ইউক্রেনের এই অবস্থান দুই দেশের পারস্পরিক আস্থাকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং ভবিষ্যতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিরোধীদের প্রশ্ন, সরকার বিষয়টি গোপন করল কেন?
তবে ইউক্রেনের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমালোচনার মুখে পড়েছে।
বিরোধী দল পিপল পাওয়ার পার্টির নেতা আন চোল-সু প্রশ্ন তুলেছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার জনগণকে কেন নিজেদের সরকারের কাছ থেকে নয়, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে দেশে উত্তর কোরীয় যুদ্ধবন্দীদের উপস্থিতির খবর জানতে হলো।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি প্রেসিডেন্ট লির কাছে জানতে চান, সরকার কেন বিষয়টি গোপন রেখেছিল। এমনকি উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনও তথ্য প্রকাশ পেলে প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
আন চোল-সু আরও জানতে চান, সরকার কি ওই দুই যুদ্ধবন্দীকে শেষ পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ায় ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা করেছিল কি না।
রাশিয়ার হয়ে কত উত্তর কোরীয় সেনা যুদ্ধ করছে?
ইউক্রেন ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় সহায়তার জন্য প্রায় ১৪ হাজার থেকে ১৫ হাজার উত্তর কোরীয় সেনা পাঠানো হয়েছে।
তাদের বেশির ভাগকে রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছিল। ইউক্রেনীয় বাহিনীর অগ্রযাত্রা ঠেকানো এবং ওই অঞ্চলে রুশ নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তাদের ব্যবহার করা হয়েছে বলে ইউক্রেন ও দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র উত্তর কোরিয়া শুধু সেনাই নয়, মস্কোকে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রও সরবরাহ করেছে বলে ইউক্রেন ও স্বাধীন বিভিন্ন মূল্যায়নে উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে কামান ও মর্টারের গোলা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, দূরপাল্লার কামান এবং একাধিক রকেট নিক্ষেপ ব্যবস্থা।
দুই যুদ্ধবন্দীর ভবিষ্যৎ কী?
দক্ষিণ কোরিয়ায় পৌঁছানোর পর দুই সেনাকে জিজ্ঞাসাবাদ ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এরপর তাদের সুরক্ষা দেওয়া হবে কি না এবং পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া শুরু হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে সিউল।
সোমবার দক্ষিণ কোরিয়ার একীকরণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট আইন ও অতীতের নজির অনুসরণ করে দুই সেনার বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে।
এ ক্ষেত্রে ‘উত্তর কোরীয় পলাতকদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসন সহায়তা আইন’সহ সংশ্লিষ্ট আইন বিবেচনায় নেওয়া হবে।
দক্ষিণ ও উত্তর কোরিয়া ১৯৫০-৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধের পর আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে কার্যত বিভক্ত হয়ে আছে। যুদ্ধের অবসান হয়েছিল ১৯৫৩ সালের একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে; পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। ফলে দুই দেশ প্রযুক্তিগতভাবে এখনও যুদ্ধে রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় হাজার হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে এবং দুই মিত্র নিয়মিত সামরিক মহড়াও পরিচালনা করে। উত্তর কোরিয়া এসব মহড়ার তীব্র বিরোধিতা করে আসছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার একীকরণ মন্ত্রণালয়ের লক্ষ্য দুই কোরিয়ার একীকরণে কাজ করা। তবে পিয়ংইয়ং এ ধরনের একীকরণের বিরোধিতা করে।
আইন অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়া থেকে আসা ব্যক্তিরা দক্ষিণ কোরিয়ায় সুরক্ষা পাওয়ার আবেদন করলে তাদের বিষয়ে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা অস্থায়ী সুরক্ষামূলক হেফাজতে রেখে তদন্ত করতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারেন দুই সেনা
দক্ষিণ কোরিয়ার বিরোধী দলের আইনপ্রণেতা ইউ ইয়ং-ওন ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রিয়ায় ওই দুই সেনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তার দাবি, তারা উত্তর কোরিয়ার বিশেষ বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন।
ইউ ইয়ং-ওনের মতে, ওই দুই সেনার কাছ থেকে উত্তর কোরিয়ার সামরিক প্রশিক্ষণ, সামরিক সক্ষমতা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে পিয়ংইয়ংয়ের অংশগ্রহণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
ফলে যুদ্ধবন্দী হিসেবে তাদের আটক ও দক্ষিণ কোরিয়ায় স্থানান্তরের বিষয়টি শুধু মানবিক বা কূটনৈতিক ইস্যু নয়, উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা ও রাশিয়ার সঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ের সামরিক সহযোগিতা বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সূত্র: আল-জাজিরা