ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে একজোট হয়েছেন দেশটির পাঁচ বিরোধী নেতা। আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে তারা নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর তেল আবিবে এক বৈঠকে তারা অনাক্রমণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। তবে আদর্শিক বিভেদ থাকা সত্ত্বেও তাদের এই ঐক্য ইসরায়েলের রাজনীতিতে কতটা পরিবর্তন আনতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদের বাসভবনে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে অংশ নেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট, সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট, ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান এবং ইসরায়েল বেইতেনু পার্টির প্রধান আভিগদর লিবারম্যান। তাদের যৌথ লক্ষ্য হিসেবে একটি ‘ইহুদিবাদী, দায়িত্বশীল সরকার’ গঠন এবং দেশ পুনর্গঠনের কথা বলা হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত এই নেতাদের অধিকাংশই মূলত ডানপন্থী রাজনীতিতে বিশ্বাসী। ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কিংবা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের স্থায়ী সমাধান তাদের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে নেই। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলার বিষয়েও তাদের অধিকাংশের অবস্থান নেতানিয়াহুর নীতির কাছাকাছি।
লন্ডনের কিংস কলেজের বিশ্লেষক আহরন ব্রেগম্যানের মতে, বিরোধী শিবিরের প্রভাবশালী নেতারা ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার মূল প্রশ্নটি এড়িয়ে যাচ্ছেন। তার ভাষায়, ইসরায়েল সামগ্রিকভাবেই ডানপন্থী একটি দেশ।
গাদি আইজেনকোট: ইয়াশার
সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট ২০২২ সালে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ৬৬ বছর বয়সী এই নেতা ২০২৫ সালে ইয়াশার পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন।
দক্ষ সরকার গঠন, অতি-রক্ষণশীল ইহুদিদেরসহ সবার জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার আগে নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা তদন্তে রাষ্ট্রীয় কমিশন গঠনের পক্ষে তিনি।
২০২৪ সালের জুনে যুদ্ধ শেষ করার সুস্পষ্ট কৌশল না থাকার অভিযোগ তুলে নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভা ছাড়েন আইজেনকোট। তবে ইরানসহ বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের লক্ষ্য নিয়ে তিনি সরাসরি প্রশ্ন তোলেননি। বরং এসব অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইসরায়েলের নির্ভরতা এবং লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতায় মার্কিন বিধিনিষেধের সমালোচনা করেছেন।
নির্বাচনের পর আরব দল ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা রা’আমকে নিয়ে সরকার গঠনের সম্ভাবনাও নাকচ করেছেন তিনি।
নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদ: বেয়াখাদ
সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদ ২০২৬ সালের এপ্রিলে বেয়াখাদ নামে যৌথ নির্বাচনী জোট গঠন করেন। ২০২১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে তারা পালাক্রমে সরকার পরিচালনা করেছিলেন।
৫৪ বছর বয়সী বেনেট অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের দীর্ঘদিনের সমর্থক। তার জোটসঙ্গী ৬২ বছর বয়সী লাপিদ মধ্যপন্থী ইয়েশ আতিদ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা। লাপিদ বেনেটকে ‘ডানপন্থী, তবে সৎ রাজনীতিক’ বলে বর্ণনা করেছেন।
ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে লাপিদ সরব হলেও এসব অভিযানের যৌক্তিকতা নিয়ে সচরাচর প্রশ্ন তোলেন না।
অন্যদিকে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জোরালো সমর্থক বেনেট ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কাতারের রাজধানী দোহায় হামাস নেতাদের লক্ষ্য করে ইসরায়েলি হামলার প্রশংসা করেছিলেন। ওই হামলায় কাতারের একজন নিরাপত্তাকর্মী নিহত হন।
এই দুই নেতা এখন কেবল ইহুদিবাদী দলগুলোর সমন্বয়ে সরকার গঠনের পক্ষে। আরব দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করতেও তারা রাজি নন।
আভিগদর লিবারম্যান: ইসরায়েল বেইতেনু
৬৮ বছর বয়সী আভিগদর লিবারম্যান এই বিরোধী জোটের অন্যতম কট্টর ডানপন্থী নেতা। রুশভাষী অভিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব করতে তিনি ১৯৯৯ সালে ইসরায়েল বেইতেনু পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন।
একসময় নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী থাকলেও এখন তার নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করেছেন লিবারম্যান। অতি-রক্ষণশীল ইহুদি দলগুলোর অংশগ্রহণ কিংবা আরব দলগুলোর সমর্থনে গঠিত সরকারেও তিনি থাকতে চান না।
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের ধারাবাহিক সমর্থক লিবারম্যান ২০১৮ সালে বলেছিলেন, গাজায় কোনও নিরপরাধ মানুষ নেই। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দোহায় হামলার জন্য নেতানিয়াহুর ক্ষমা চাওয়ারও বিরোধিতা করেন তিনি। লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান সীমিত রাখার বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছেন এই নেতা।
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর প্রতি বিরোধিতাই লিবারম্যানকে এই জোটে এনেছে। তবে তার নিজস্ব সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে এবং রুশভাষী ভোটারদের মধ্যে তার প্রভাব উল্লেখযোগ্য। ভবিষ্যতে তিনি আবারও নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোটে ফিরে যেতে পারেন বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
ইয়ার গোলান: ডেমোক্র্যাটস
৬৪ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ইয়ার গোলান এই জোটের একমাত্র নেতা, যিনি বামপন্থী রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করেন এবং ফিলিস্তিনি দলগুলোর সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে তুলনামূলকভাবে আগ্রহী। ২০২৪ সালে লেবার পার্টি ও মধ্য-বামপন্থী মেরেতজের একীভূত হওয়ার মধ্য দিয়ে ডেমোক্র্যাটস পার্টি গঠিত হয়।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার সময় দক্ষিণ ইসরায়েলে ছুটে গিয়ে প্রতিরোধে সহায়তা করায় তিনি দেশে প্রশংসা পেয়েছিলেন।
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের লক্ষ্য ও কৌশলের সমালোচনায় অন্য বিরোধী নেতাদের তুলনায় বেশি সরব গোলান। ২০২৫ সালের মে মাসে তিনি বলেছিলেন, “একটি সুস্থ দেশ শখের বশে শিশুদের হত্যা করে না।”
গাজায় ফিলিস্তিনি শিশুদের অনাহারে রাখার জন্যও তিনি ইসরায়েলি মন্ত্রীদের সমালোচনা করেছিলেন। তবে ইসরায়েলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পরে বক্তব্যটি থেকে কিছুটা সরে আসেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার ঘটনাকেও তিনি কৌশলগত ভুল হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তার যুক্তি ছিল, খামেনির মৃত্যু প্রাপ্য ছিল কি না, সেটি মূল বিষয় নয়; বরং এ ঘটনা ইসরায়েলের স্বার্থ পূরণ করেছে কি না, সেটিই বিবেচ্য।
তবে ফিলিস্তিনি দলগুলোর সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী হলেও আরব বালাদ পার্টির নেতা সামি আবু শাহাদেহকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার পক্ষে অবস্থান নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েন গোলান।
জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়
এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসরায়েলি রাজনীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ রই জুরের মতে, গোলান ও লিবারম্যানের মধ্যে নিরাপত্তা ও সংঘাত নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও তাদের ছাড়া বিজয়ী জোট গঠন কঠিন। নেতানিয়াহুর বিরোধিতা, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি সমর্থন এবং অতি-রক্ষণশীল ইহুদিদের সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতির বিরোধিতার মতো বিষয়ে তাদের মিল রয়েছে।
তবে এই পাঁচ নেতার ঐক্য নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে পারবে কি না, তা নির্ভর করবে নির্বাচনী ফলাফল, জোটের অভ্যন্তরীণ সমঝোতা এবং সরকার গঠনের সক্ষমতার ওপর। নেতানিয়াহুর বিকল্প নেতৃত্ব সামনে এলেও ফিলিস্তিন প্রশ্ন ও আঞ্চলিক সংঘাতের মতো মৌলিক বিষয়ে তাদের অবস্থান কতটা বদলাবে, সেটিই থেকে যাচ্ছে বড় প্রশ্ন। সূত্র: আল-জাজিরা