মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধে ইরানের কৌশলে নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে শাহেদ ড্রোন। তুলনামূলক কম খরচে তৈরি এই কামিকাজে ড্রোন ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার চেষ্টা করছে তেহরান। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ড্রোনের ঝাঁক দিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নাজেহাল করার পর বড় আকারের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পথ তৈরি করা হতে পারে।
গত সপ্তাহে ইরানে যৌথ হামলা শুরু করে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র। এর পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় মার্কিন মিত্রদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাতে শুরু করে ইরান। এসব হামলায় এখনো বড় ধরনের ক্ষতি না হলেও প্রতিরোধ করতে গিয়ে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, অত্যাধুনিক মার্কিন প্রযুক্তির সহায়তায় উপসাগরীয় দেশগুলো এখন পর্যন্ত ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও কামিকাজে ড্রোনের হামলা প্রতিহত করতে পারছে। তবে হামলার তীব্রতায় কাতার, কুয়েত, বাহরাইনের অস্ত্র মজুতে চাপ তৈরি হয়েছে। কারণ একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন ধ্বংস করতে প্যাট্রিয়ট, থাড ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় দুই থেকে তিনটি ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করতে হয়।
সিএনএন জানায়, গত বুধবার পর্যন্ত ইরান অন্তত দুই হাজার শাহেদ ড্রোন নিক্ষেপ করেছে।
শাহেদ ড্রোন মূলত একমুখী হামলার জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি ক্ষেপণাস্ত্রের মতোই নিক্ষেপ করা হয় এবং লক্ষ্যবস্তুতে গিয়ে আঘাত হানে। নিক্ষেপের পর এটিকে ফিরিয়ে আনা বা পুনরায় ব্যবহার করা যায় না। এ ধরনের ড্রোনকে কামিকাজে অস্ত্রও বলা হয়।
এই ড্রোনের বড় সুবিধা হলো তুলনামূলক কম খরচে বিপুল সংখ্যায় উৎপাদন করা যায়। অনেক সামরিক বিশ্লেষক একে গরিবের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বলেও উল্লেখ করেন।
সিএনবিসি নিউজের তথ্য অনুযায়ী, একটি শাহেদ ড্রোন তৈরিতে গড়ে খরচ হয় ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার মার্কিন ডলার। অন্যদিকে একটি সাধারণ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে ব্যয় হতে পারে ১০ লাখ থেকে ১ কোটি ডলার। আবার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর তৈরিতে খরচ পড়ে প্রায় ৩০ লাখ থেকে ১ কোটি ডলার।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান সপ্তাহে প্রায় হাজারখানেক ড্রোন তৈরির সক্ষমতা রাখে। তাদের কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো একসঙ্গে অনেক ড্রোন নিক্ষেপ করা। এতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যস্ত হয়ে পড়ে এবং দ্রুত মজুত কমে যায়।
ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞ ফাবিয়ান হফম্যান দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, ইরানের হামলা প্রতিহত করতে উপসাগরীয় দেশগুলো প্রচুর ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করছে। এই ধারা দীর্ঘ সময় ধরে বজায় রাখা কঠিন হবে।
হফম্যানের দাবি অনুযায়ী, ইউএইর কাছে প্রায় এক হাজার ইন্টারসেপ্টর রয়েছে। কুয়েতের কাছে প্রায় পাঁচশ এবং বাহরাইনের কাছে প্রায় একশ।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ইরানের কাছে এখনো দুই হাজারের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র থাকতে পারে। তাই ড্রোন হামলার মাধ্যমে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল করে পরে বড় আকারের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টা করা হতে পারে।
মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিসের বিশেষজ্ঞ প্যাট্রিসজা বাজিলজিক বলেন, শাহেদ ড্রোন তুলনামূলক সস্তা অস্ত্র। যুদ্ধের প্রাথমিক ধাপে ড্রোন হামলা চালিয়ে পরে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের পথ তৈরি করাই হতে পারে কৌশল।
তবে ইরান কত দিন এই ড্রোন হামলা চালিয়ে যেতে পারবে, তা নির্ভর করবে তাদের কাঁচামালের মজুত ও সরবরাহের ওপর।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েলের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, সামরিক সক্ষমতা এবং আধুনিক অস্ত্রের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করার মতো সামর্থ্য ইরানের নেই। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে উন্নত প্রযুক্তি তৈরি করাও তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।
এ কারণে মার্কিন মূল ভূখণ্ডের বদলে উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটি এবং মিত্র দেশগুলোই ইরানের হামলার প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠছে। ইরানের সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, এভাবে চাপ বাড়াতে পারলে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটকে যুদ্ধ থেকে সরে আসতে বাধ্য করা সম্ভব হতে পারে। তবে সেই সময় পর্যন্ত টিকে থাকাটাই তেহরানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ, সিএনএন, সিএনবিসি নিউজ, বিবিসি