প্রতি বছর ৩ মে এলে আমরা বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উদযাপন করি। আলোচনা হয়, সেমিনার হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টের বন্যা নামে। কিন্তু প্রশ্ন হলো মুক্ত গণমাধ্যম কি শুধু একদিনের আনুষ্ঠানিকতা, নাকি এটি প্রতিদিনের চর্চা ও সংগ্রামের বিষয়?
মুক্ত গণমাধ্যম একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ। রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান, জনগণের কণ্ঠস্বর তুলে ধরা এসবই গণমাধ্যমের মৌলিক দায়িত্ব।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই গণমাধ্যমকে নানা চাপ, প্রভাব ও সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করতে হয়। কখনো রাজনৈতিক চাপ, কখনো কর্পোরেট স্বার্থ, আবার কখনো নিজের প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বাধা সব মিলিয়ে সত্য প্রকাশের পথ সবসময় মসৃণ থাকে না।
আজকের যুগে গণমাধ্যম শুধু প্রথাগত পত্রিকা বা টেলিভিশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অনলাইন পোর্টাল, ইউটিউব, ফেসবুক সবই এখন তথ্যপ্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এতে একদিকে যেমন তথ্যপ্রাপ্তি সহজ হয়েছে, অন্যদিকে ভুয়া খবর ও অপপ্রচারের ঝুঁকিও বেড়েছে। ফলে মুক্ত গণমাধ্যম মানে শুধু স্বাধীনতা নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দায়িত্বশীলতা ও নৈতিকতার প্রশ্নও।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কে প্রকৃত সাংবাদিক? হাতে মাইক্রোফোন বা ক্যামেরা থাকলেই কেউ সাংবাদিক হয়ে যায় না। প্রকৃত সাংবাদিকতা প্রমাণ হয় কাজের মাধ্যমে তথ্যের সত্যতা যাচাই, নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মধ্য দিয়ে। এই জায়গাটিতেই আজ সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জ দেখা যাচ্ছে।
আরেকটি বাস্তবতা আমরা এড়িয়ে যেতে পারি না গণমাধ্যমের ভেতরেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রয়োজন আছে। অনেক সময় অভিযোগ ওঠে, কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করে। এতে পুরো পেশাটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তাই গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পাশাপাশি এর ভেতরের শুদ্ধতাও নিশ্চিত করা জরুরি।
মুক্ত গণমাধ্যম মানে সীমাহীন স্বাধীনতা নয়; বরং এটি দায়িত্বশীল স্বাধীনতা। এখানে যেমন সরকারের হস্তক্ষেপ অনুচিত, তেমনি সাংবাদিকদেরও উচিত পেশাগত নীতি মেনে চলা। সত্য প্রকাশের সাহস থাকতে হবে, কিন্তু সেই সত্য হতে হবে যাচাইকৃত ও নিরপেক্ষ।
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় এই লড়াই এখনো শেষ হয়নি। বরং প্রযুক্তির এই যুগে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে এটি আরও জটিল হয়ে উঠছে। তাই প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ রাষ্ট্র, গণমাধ্যম এবং জনগণ সবার।
শেষ পর্যন্ত, মুক্ত গণমাধ্যম কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি প্রয়োজন। কারণ যেখানে গণমাধ্যম স্বাধীন নয়, সেখানে সত্য চাপা পড়ে যায়, আর যেখানে সত্য চাপা পড়ে, সেখানে গণতন্ত্রও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই এই দিবসে প্রতিজ্ঞা হোক মুক্ত গণমাধ্যম শুধু উদযাপন নয়, বরং প্রতিদিনের চর্চা ও দায়িত্ব।