কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার ৩১ নং হিলচিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘিরে উঠেছে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ। শিক্ষকদের নিয়মিত পাঠদান না করা, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দিয়ে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত কাজ করানো, টিফিনের খাবারে অনিয়ম, শিক্ষক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ এবং বিদ্যালয়ের পরিবেশ নিয়ে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত প্রশ্ন-সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। স্থানীয় বাসিন্দা, সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী এবং বিদ্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগের কথা জানা গেছে। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা জরুরি।
সম্প্রতি বিদ্যালয়ে গিয়ে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা করা হলে অভিযোগ অনুযায়ী, কয়েকজন শিক্ষককে নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পরিবর্তে অফিসকক্ষে অবস্থান করতে দেখা যায়। তাদের কেউ কেউ মোবাইল ফোন ব্যবহার এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভিডিও কলে ব্যস্ত ছিলেন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পূরবী রানী সাহা এবং সহকারী শিক্ষক মোবারক হোসেনের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তারা অভিযোগগুলো এড়িয়ে যান।
কোমলমতি শিক্ষার্থীদের দিয়ে বাজার ও গৃহস্থালির কাজ। বিদ্যালয়টির বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো, শিক্ষার্থীদের দিয়ে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত কাজ করানো। স্থানীয়দের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের দিয়ে প্রধান শিক্ষক পূরবী রানী সাহার বাসার জন্য বাজার করানো, সকালে বাজার থেকে নাশতা নিয়ে আসা এবং বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ ও অফিসকক্ষ পরিষ্কার করানোর মতো কাজ করানো হয়।
স্থানীয় কয়েকজন সাবেক শিক্ষার্থীও দাবি করেছেন, অতীতে তারা প্রধান শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়তে গেলে তাদের দিয়ে তার পরিবারের শিশুদের দেখাশোনা, খাওয়ানো, গোসল করানো এবং কাপড় ধোয়ানোর মতো ব্যক্তিগত কাজ করানো হয়েছে।
একাধিক সাবেক শিক্ষার্থীর ভাষ্য, এসব নিয়ে কোনো কোনো সময় শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সঙ্গে শিক্ষকের বাকবিতণ্ডাও হয়েছে।
দপ্তরির বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ: বিদ্যালয়ের দপ্তরি মোবারক মিয়াকে ঘিরেও স্থানীয়দের মধ্যে নানা অভিযোগ রয়েছে।
একজন স্থানীয় বাসিন্দার দাবি, দপ্তরি হিসেবে মোবারক মিয়া রাতে বিদ্যালয়ে অবস্থান করেন এবং বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় তলায় স্থানীয় কিছু মাদকসেবীকে নিয়ে মাদক সেবনের আসর বসান। এমনকি সেখানে নারীদের নিয়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয় বলেও অভিযোগ করেছেন ওই ব্যক্তি। এ বিষয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত জরুরি। কারণ সরকারি একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন রাতে কারা ব্যবহার করছে, সেখানে কেউ অবস্থান করছে কি না এবং বিদ্যালয়ের সম্পদ বা অবকাঠামো কোনো অননুমোদিত কাজে ব্যবহƒত হচ্ছে কি না-এসবের জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন।
বিশেষ করে বিদ্যালয়টি যদি রাতে নিয়মিতভাবে অরক্ষিত থাকে, তাহলে সেখানে শিশুদের নিরাপত্তা ও সরকারি সম্পদের সুরক্ষাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
টিফিনেও অনিয়মের অভিযোগ:
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য টিফিনের ব্যবস্থা থাকলেও ৩১ নং হিলচিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খাবারের মান ও সরবরাহ নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, শিক্ষার্থীদের নিম্নমানের খাবার দেওয়া হয় এবং কোনো কোনো সময় দুই-তিন দিন পরপর খাবার সরবরাহ করা হয়। অব্যবহƒত অর্থের একটি অংশ প্রধান শিক্ষক পূরবী রানী সাহা, সহকারী শিক্ষক মোবারক হোসেন এবং দপ্তরি মোবারক মিয়ার মধ্যে ভাগাভাগি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের পদায়নে
ঘুষের অভিযোগ:
বিদ্যালয়ের সদ্য সাবেক প্রধান শিক্ষক শ্রী মতি নমীতা সাহা অবসর নেওয়ার পর বর্তমান প্রধান শিক্ষক পূরবী রানী সাহার প্রধান শিক্ষক পদে আসা নিয়েও অভিযোগ উঠেছে।
বিদ্যালয়ের কর্মরত দুই সহকারী শিক্ষকের দাবি, পূরবী রানী সাহাকে প্রধান শিক্ষক এবং মোবারক হোসেনকে সহকারী প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পাইয়ে দিতে উপজেলা শিক্ষা অফিসের একজন কর্মকর্তাকে মোটা অঙ্কের অর্থ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, এ ক্ষেত্রে যথাক্রমে তিন লাখ ও দুই লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে বাজিতপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।