ব্যাংক ঋণ সুদের সর্বোচ্চ হারসীমা ছিল ৯%, যা প্রত্যাহার হওয়ার পর ঋণ ও আমানতের সুদের হারের ব্যবধান (স্প্রেড) দ্রুত বেড়ে গেছে। এর ফলে ঋণের সুদের হার প্রায় আমানতের সুদের হারের দ্বিগুণে পৌঁছেছে, এবং কিছু ক্ষেত্রে এই ব্যবধান ছাড়িয়ে গেছে ৮%–১০% পর্যন্ত।
ঋণ নেওয়া এবং এর আনুষাঙ্গিক খরচ ব্যয়বহুল হয়ে ওঠায় বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলার প্রবণতাও হ্রাস পেয়েছে, যা বিনিয়োগে স্থবিরতা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরই ধীরগতির প্রতিফলন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে ব্যাংকগুলোর গড় আমানত সুদের হার ছিল ৬.৩৬%, আর গড় ঋণ সুদের হার ১২.১৪%। ফলে গড় স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৫.৭৮%। তবে আটটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে স্প্রেড ৮%–১০% এর বেশি এবং আরও ১৪টি ব্যাংকের স্প্রেড ৬%–৮% এর মধ্যে রয়েছে। অন্যদিকে, ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে—যে মাসে স্প্রেডের ওপর আরোপিত সীমা প্রত্যাহার করা হয়—গড় স্প্রেড ছিল মাত্র ৩.৩৫%।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সুদের হার পুরোপুরি সহজ করা হলেও ব্যাংকিং খাতে প্রতিযোগিতার ঘাটতি এবং ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি নিতে অনীহা স্প্রেডকে অস্বাভাবিকভাবে উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এর ফলে উৎপাদনশীল খাতে অর্থের প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন ডেইলি সানকে বলেন, “যখন আমানতের সুদের হার কমে কিন্তু ঋণের সুদের হার সমানুপাতিকভাবে কমে না, তখন বোঝা যায় বাজার পুরোপুরি কার্যকর নয়। উচ্চ স্প্রেড বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে সৃষ্টি করে বিশাল প্রতিবন্ধকতা।”
তিনি আরও বলেন,“বর্তমানে ব্যাংকগুলো ঝুঁকি নিতে আগ্রহী নয়। শিল্প ও ব্যবসায়ে ঋণ দেওয়ার বদলে তারা ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করে সহজ মুনাফা অর্জন করছে। এতে বাস্তব অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ সংকুচিত হচ্ছে।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, খেলাপি ঋণ যদি কমানো না যায়, তাহলে ব্যাংকগুলো ঝুঁকি পুষিয়ে নিতে ঋণের সুদের হার আরও বাড়াবে, এবং এর ফলে ভোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের ওপর চাপ বাড়বে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, “বাজারভিত্তিক সুদের হার মানে তদারকির অভাব নয়। নৈতিক চাপের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি দ্রুত কমিয়ে আনতে হবে; তা না হলে শক্তিশালী ব্যাংকগুলো পরিস্থিতির সুযোগ নেবে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “যদি দীর্ঘ সময় ধরে স্প্রেড ৬%–৭% এর ওপরে থাকে, তাহলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা কর্মসংস্থান ও শিল্প উৎপাদনের ওপর সৃষ্টি করবে চাপ।”
সূত্র জানায়, ক্রমবর্ধমান সুদের স্প্রেড নিয়ে ৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত একটি ব্যাংকারদের বৈঠকে আলোচনা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালক বলেন, ২০২৪ সালের নির্দেশনার মাধ্যমে সুদের হার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করা হলেও ব্যাংকগুলো অতিরিক্তভাবে স্প্রেড বাড়িয়েছে। এই কারণে ঋণ ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে এবং ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে যেখানে ঋণ ও আমানতের সুদের হারের ব্যবধান ৩% এর নিচে রাখা হয়, সেখানে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই স্প্রেড প্রায় ৬% এর আশপাশে অবস্থান করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বৈঠকে পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন এবং স্প্রেড সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান জানান। বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র অনুযায়ী, আপাতত কোনো নির্দিষ্ট সীমা আরোপ না করে নৈতিক চাপের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে স্প্রেড কমাতে বলা হবে।
কেন স্প্রেড বাড়ছে
ব্যাংকারদের সঙ্গে আলোচনায় জানা গেছে, কিছু ব্যাংকের দুর্বল অবস্থার কারণে এক শ্রেণির আমানতকারী তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ব্যাংকে অর্থ স্থানান্তর করছেন। ফলে ভালো অবস্থানে থাকা ব্যাংকগুলো কম সুদের হার দিয়েও বিপুল পরিমাণ আমানত সংগ্রহ করতে পারছে। তবে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা দুর্বল থাকায় তারা একই গতিতে ঋণের সুদের হার কমাচ্ছে না।
এ ছাড়া ব্যাংকগুলো ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করে ১০% এর বেশি ঝুঁকিমুক্ত মুনাফা অর্জন করছে। এতে শিল্প ও বাণিজ্যে ঋণ না দিয়েও ভালো আয় করা সম্ভব হচ্ছে। এই কারণে স্প্রেড বেড়েছে, ব্যাংকের মুনাফা বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
বিনিয়োগ ও এলসির ওপর নেতিবাচক প্রভাব
উচ্চ ঋণ সুদের হার নতুন বিনিয়োগে উদ্যোক্তাদের আগ্রহকে দিয়েছে কমিয়ে, অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণ পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছে। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এলসি খোলার পরিমাণ কমে গেছে, যা উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছর ২৬-এর প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই–নভেম্বর) মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খোলা ৩২.২২% বেড়েছে, কিন্তু এলসির নিষ্পত্তির হার কমেছে ১৬.৭৭%, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কম। একই সময়ে মধ্যবর্তী পণ্যের এলসি খোলা ১.৯৫% বেড়েছে, অথচ নিষ্পত্তির হার কমেছে ১৬.৪১%। কাঁচামালের ক্ষেত্রে এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি মাত্র ০.৪৫% হারে সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে।
এর ফলে টানা ছয় মাস ধরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৭% এর নিচে আটকে আছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরের শেষে এই প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬.৫৮%-এ, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও কম।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, “ব্যাংকগুলো আমানতের সুদের হার কমালেও ঋণের সুদের হার সে অনুযায়ী কমায়নি। তাই স্প্রেড অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। উৎপাদনে বিনিয়োগের জন্য ১৪%–১৬% সুদে ঋণ নেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে এবং দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”
২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংক ঋণের সুদের হারে ৯% সীমা কার্যকর ছিল। আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী ২০২৩ সালের জুলাইয়ে “সিক্স-মান্থ মুভিং অ্যাভারেজ রেট অব ট্রেজারি বিল (SMART)” সুদের হার ব্যবস্থা চালু করা হয় এবং ওই বছরের নভেম্বরে স্প্রেডের ওপর ৪% সীমা প্রত্যাহার করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৮ মে সুদের হার পুরোপুরি উদারীকরণ করা হয়। একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে ‘ক্রলিং পেগ’ ব্যবস্থা চালু করা হয়, যার ফলে এক ধাপে ডলারের দর বেড়ে যায় ৭ টাকা পর্যন্ত।