সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬, ০২:৪৮ অপরাহ্ন
নোটিশ:
তথ্য ও প্রচার মন্ত্রণালয় নিবন্ধনকৃত অনলাইন নিউজ পোর্টাল দ্য পিপলস্ নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকে সারা দেশে জেলা প্রতিনিধি নিয়োগ করা হবে। মোবাইল: ০১৭১১-১১৬২৫৭, ০১৭১২-৪০৭২৮২ ' ই-মেইল : thepeopelesnews24@gmail.com

বন্ধ ৩২৭ কারখানা, কর্মহীন দেড় লক্ষাধিক শ্রমিক

অনলাইন ডেস্ক: / ৯ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : সোমবার, ২৬ জানুয়ারী, ২০২৬
-ফাইল ছবি।

গাজীপুরে বন্ধ ১৮৮, বেকার এক লাখ ১৫ হাজার ৩৭৯। সাভার-আশুলিয়ায় বন্ধ ১৩৯, বেকার ৪০ হাজার শ্রমিক।

গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ীর নীলনগরে শতভাগ রপ্তানিমুখী মুকুল নিটওয়্যার লিমিটেড কারখানায় কাজ করতেন তিন হাজারের বেশি শ্রমিক। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও ক্রয়াদেশ সংকটে এই কারখানায় উৎপাদন কমতে থাকে। তার পরও ৬৭০ জন শ্রমিক নিয়ে তিলে তিলে গড়ে তোলা কারখানাটি চালু রেখেছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা মো. মইনুল ইসলাম মুকুল। শেষ পর্যন্ত আর রক্ষা হয়নি।

উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আর্থিক সংকটে গত ১৭ ডিসেম্বর কারখানাটি স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। বন্ধ হয়ে পড়া কারখানার কোয়ালিটি পরিদর্শক মো. শরিফ হোসেন বলেন, কারখানাটি বন্ধ হয়ে গেছে। ২৮০ জন পুরুষ ও ৩৯০ জন নারী শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। এই শ্রমিকদের সংসার চালানো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শুধু এই কারখানা নয়. ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় দেড় বছরে গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ায় স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে ছোট-বড় ৩২৭টি কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে গত ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত গাজীপুরে ছোট-বড় ১৮৮টি কারখানা স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে বন্ধ করা হয়েছে। তাতে বেকার  হয়ে পড়েছেন এক লাখ ১৫ হাজার ৩৭৯ জন শ্রমিক। এর মধ্যে স্থায়ীভাবে কারখানা বন্ধ হওয়ায় বেকার হন ৯০ হাজার ৭৬০ শ্রমিক-কর্মচারী।

শিল্প পুলিশের তথ্য বলছে, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর প্রায় দেড় বছরে সাভার ও আশুলিয়ায় ১৩৯টি কারখানা বন্ধ করা হয়েছে। এসব কারখানার প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন।

জানা গেছে, গাজীপুরে বন্ধ নামি-দামি কারখানার মধ্যে রয়েছে বেক্সিমকোর ১৩টিসহ শ্রীপুরের ডার্ড কম্পোজিট, টঙ্গীর খাঁপাড়া এলাকার সিজন ড্রেসেস, কোনাবাড়ীর পলিকন লিমিটেড, টেক্সটিল ফ্যাশন, ষ্ট্যান্ডার্ড সিরামিক, ক্লাসিক ফ্যাশন, লা-মুনি অ্যাপারেলস, নাসা গ্রুপের লিজ ফ্যাশন, স্বাধীন গার্মেন্ট, মিককিফ অ্যাপারেলসের মতো বিজিএমইএভুক্ত অনেক প্রতিষ্ঠান।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বেকার শ্রমিকদের ৯০ শতাংশই বেকার রয়েছেন। অনেকে পেশা বদল করেছেন। কেউ কেউ রিকশা চালাচ্ছেন, কেউ দিনমজুরির কাজ করছেন। আবার কেউ পা দিয়েছেন অপরাধজগতে। কারখানা বন্ধের প্রভাব পড়েছে স্থানীয় অন্য ব্যবসা-বাণিজ্যে।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর বন্ধ হয়ে যাওয়া লিজ অ্যাপারেলসের সিনিয়র সুপারভাইজার গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর মো. রুস্তম আলী (৪৮) বলেন, ‘লিজ অ্যাপারেলস দেশের নামি কারখানার একটি ছিল। এখানে কাজ করে গর্ব বোধ করতাম। কখনো বেতন না পাওয়ার দুশ্চিন্তা করতে হয়নি। নির্দিষ্ট তারিখে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বেতন-ভাতা ঢুকে যেত। কাজের পরিবেশও ছিল অনেক উন্নত। কিন্তু সবকিছু ওলটপালট হয়ে যায় ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংসার কিভাবে চলবে সেই চিন্তায় চোখে-মুখে অন্ধকার দেখছি।’

গাজীপুর মহানগরীর কাশিমপুরের চক্রবর্তী এলাকার বাড়ির মালিক মো. ইদ্রিস মোল্লা বলেন, এলাকার বেশির ভাগ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস ছিল বাড়িভাড়া। বেক্সিমকোর ২৮ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী বাড়ি ভাড়া নিয়ে পরিবার নিয়ে বাস করতেন। শ্রমিকদের ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছিল বাজার, দোকানপাট ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেশির ভাগ শ্রমিক গ্রামে ফিরে গেছেন। এ কারণে ফাঁকা পড়ে আছে ঘরবাড়িসহ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। অনেক বাড়ির মালিক ব্যাংকঋণ নিয়ে বাড়ি নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছিলেন। এখন ভাড়াটিয়ার অভাবে ভাড়া না পেয়ে ক্ষতির মুখে পড়েছেন বহু বাড়ির মালিক।

জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক জোট বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, গাজীপুর শিল্প এলাকায় একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে হলেও নতুন করে কারখানা গড়ে উঠছে না। কারখানা বন্ধ হওয়ায় চাকরি হারাচ্ছেন হাজার হাজার শ্রমিক। তা ছাড়া চালু কারখানায় প্রতিদিনই শ্রমিক ছাঁটাই চলছে। বেকার পোশাক শ্রমিকরা চাকরি ছেড়ে অটোরিকশা চালনা, ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনাসহ বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত হয়েছেন। অনেকে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন। আবার অনেকে গাজীপুরে থেকে টেইলারিং, কাপড়ের দোকানসহ বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। সব মিলিয়ে গাজীপুর শ্রমিক পল্লীতে চরম দুঃসময় চলছে।

গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসেন বলেন, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৭ মাসে গাজীপুরে ছোট-বড় কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। বেকার হয়েছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। সর্বশেষ গত ২১ জানুয়ারি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে বেইস ফ্যাশন লািমটেড কারখানা। জ্বালানিসংকট, ব্যাংকিং খাতের অসহযোগিতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, কাজ না থাকা, কার্যাদেশ বাতিল, ঘন ঘন শ্রমিকদের আন্দোলন, ভাঙচুরসহ বৈশ্বিক নানা সংকটে গাজীপুরে একের পর এক তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ হচ্ছে। এতে বেকার হয়ে পড়ছেন বিপুলসংখ্যক শ্রমিক। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে স্থানীয় ব্যবসা, বাড়িভাড়াসহ বিভিন্ন আর্থিক খাতে।

সাভার-আশুলিয়ায় বন্ধ ১৩৯ কারখানা:

একের পর এক কারখানা বন্ধ হওয়ায় শিল্পাঞ্চল সাভার-আশুলিয়ায় নেমে এসেছে নীরবতা। চাকরি না থাকায় ঘরভাড়া এবং দোকান বাকি পরিশোধ করতে পারছেন না শ্রমিকরা। বাধ্য হয়ে অনেকে বাড়িতে চলে গেছেন। অনেকে পেশা পরিবর্তন করছেন।

আশুলিয়ার বুড়ির বাজারের মুদি দোকানি শফিকুর রহমান পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, ‘আগে প্রতিদিন দোকানে ১০-১৫ হাজার টাকার বিক্রি হতো। এখন তিন-চার হাজারে নেমে এসেছে। সাভার ও আশুলিয়ায় আগের মতো শ্রমিকরা নেই।

শিল্প পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর গত দেড় বছরে সাভার ও আশুলিয়ায় ১৩৯টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে স্থায়ীভাবে বন্ধ রয়েছে ৬৭টি, অস্থায়ীভাবে বন্ধ রয়েছে ৭২টি কারখানা। এসব কারখানার প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিকের বেশির ভাগই বেকার হয়ে পড়েছেন। স্থায়ীভাবে বন্ধ কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশন লিমিটেড, দ্য ড্রেসেস অ্যান্ড দি আইডিয়াস লিমিটেড, বসুন্ধরা গার্মেন্টস লিমিটেড, ছেইন অ্যাপারেলস লিমিটেড, নাসা গ্রুপ, সাউথ চায়না গ্রুপ ও ইথিক্যাল গার্মেন্টস লিমিটেড। অস্থায়ীভাবে বন্ধ কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে সিঙ্গার রেফ্রিজারেটর লিমিটেড, সিঙ্গার ইলেকট্রনিকস, এফআরএম ফ্যাশন হাউস লিমিটেড, হিলটন অ্যাপারেলস লিমিটেড, ঢাকা ই সাংহাসিরা লিমিটেড, জেইসা ফ্যাশন লিমিটেড, ফ্রাউলিন ফ্যাশন লিমিটেড, মুলনাক্স কম্পোজিট নিট গার্মেন্টস লিমিটেড, ইনসাইড নিট কম্পোজিট লিমিটেড, রংধনু স্পিনিং মিলস লিমিটেড, মনিকা অ্যাপারেলস লিমিটেড।

শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, আর্থিক সংকট, লে অফ এবং কাজ না থাকার কারণে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে দেড় বছরে সাভার ও আশুলিয়ায় ১৩৯টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।

বন্ধ নাসা গ্রুপের পোশাক শ্রমিক আলেয়া আক্তার কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চার মাস ধরে বেকার। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন কারখানায় ঘুরেও কাজ জুটছে না। এক বেলা খেয়ে অন্য বেলা উপোস থাকি।’ আলেয়ার স্বামী কখনো রিকশা চালাচ্ছেন আবার কখনো রাজমিস্ত্রির সঙ্গে জোগালির কাজ করছেন। কিন্তু এখানেও নিয়মিত কাজ জোটে না।

স্থানীয়রা জানান, বেকার শ্রমিকদের অনেকেই কাজ না পেয়ে সংসার চালাতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন। ফলে এলাকায় অস্থিরতা বাড়ছে।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু বলেন, একের পর এক কারখানা বন্ধ হওয়ায় শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়ছেন। পেটের দায়ে অন্য কাজে যোগ দিতে না পারায় অনেকেই বিপথে চলে যাচ্ছেন।

আশুলিয়ার জামগড়ার বাড়িওয়ালা আব্দুল হাকিম বলেন, ‘আমার দুটি বাড়িতে প্রায় এক শ কক্ষে পোশাক শ্রমিকরা ভাড়া থাকত। গার্মেন্টস চালু অবস্থায় কখনো এসব কক্ষ খালি থাকত না। আশপাশের অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেশির ভাগ ঘর ফাঁকা পড়ে আছে। শ্রমিকদের চাকরি না থাকায় তারা বাড়ি চলে যাচ্ছে।’ সূত্র: কালের কণ্ঠ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর