সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় এক দুবাই প্রবাসীর ক্রয়কৃত জমি রেজিষ্ট্রি করার সময় নিজের নামেই রেজিষ্ট্রি করে নিয়েছেন এক দলিল লেখক। ঘটনাটি প্রকাশ পাওয়ার পর ওই জমির ক্রেতার পক্ষে তার মা ফিরোজা খাতুন বিষয়টির প্রতিকার চেয়ে জেলা প্রশাসক, জেলা রেজিস্ট্রার, ইউএনও এবং উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
ভুক্তভোগী প্রবাসী ক্রেতা ফরহাদ হোসেন তাড়াশ উপজেলা সদরের পৌর এলাকা কহিত গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে। অভিযুক্ত দলিল লেখক মির্জা আব্দুর রব বুলবুল তাড়াশ সাব-রেজিষ্টার অফিসে কর্মরত ও একই গ্রামের বাসিন্দা।
লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, তাড়াশ পৌর এলাকার কহিত তেতুলিয়া গ্রামের মৃত সোলেমানের দুই ছেলে বাবলু, কালাম এবং দুই মেয়ে শামীমা ও সুমি খাতুন ৭ লাখ ২৬ হাজার টাকার বিনিময়ে প্রবাসী ফরহাদ আলীর কাছে দেড় বিঘা আবাদি জমি বিক্রি করেন। ২০২১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ৭৭ বছর বয়সী বৃদ্ধ নুরুল ইসলাম তাড়াশ সাব-রেজিস্টার অফিসে গিয়ে ওই জমি দলিল লেখক মির্জা আব্দুর রবের মাধ্যমে প্রবাসী ছেলে ফরহাদ আলীর নামেই রেজিষ্ট্রি করেন। যার দলিল নং-৭৮২/২১। পরবর্তিতে জমির জাবেদা নকল চাইলে তালহাবানা শুরু করেন দলিল লেখক মির্জা আব্দুর রব। বিষয়টি সন্দেহ হলে অন্য লোকের সহায়তায় ২০২৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর জমির জাবেদা নকল উত্তোলন করেন নুরুল ইসলাম। সম্প্রতি ভূমি অফিসে খাজনা-খারিজের জন্য গেলে দলিল লেখক মির্জা আব্দুর রবের নামে জমি রেজিষ্ট্রির বিষয়টি তাদের নজরে আসে।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী প্রবাসীর বাবা ফরহাদ আলী বলেন, একমাত্র সম্বল সোয়া বিঘা কৃষি জমি বিক্রি করে ছেলেকে দুবাই পাঠিয়েছি। ছেলের পাঠানো টাকায় দেড় বিঘা জমি কিনেছি। ওই জমি ক্রয় করার পর থেকে আমাদের ভোগ দখলে রয়েছে। এতোদিন পর খাজনা খারিজ করার জন্য গেলে প্রতারনার বিষয়টি ধরা পড়ে। জানতে পারি আমাদের ক্রয়কৃত জমি দলিল লেখক মির্জা আব্দুর রব বুলবুল নিজের নামে রেজিষ্ট্রি করে নিয়েছেন। ছেলে বিদেশে থাকে, আমিও পড়ালেখা জানি না। আমার অজ্ঞতা ও সরলতার সুযোগ নিয়ে দলিল লেখক মির্জা আব্দুর রব এমন প্রতারণা করেছে। ক্রয়কৃত দেড় বিঘা জমি ছাড়া আমাদের আর কোন জমি নেই। জমি ফেরত ও দলিল লেখক মির্জা আব্দুর রবের শাস্তি দাবী করেছেন তিনি।
কোহিত গ্রামের বাসিন্দা ও উলিপুর পাচান দাখিল মাদ্রাসার ইবতেদায়ী বিভাগের প্রধান মৌলভী নজরুল ইসলাম বলেন, জমি বিক্রেতা মো. বাবলু, কালাম, শামীমা ও সুমি খাতুন সম্পর্কে আমার ভাগ্নে-ভাগ্নি। তারা নুরুল ইসলামের ছেলে ফরহাদ আলীর কাছে জমি বিক্রি করেছে। জমি রেজিষ্ট্রি করার দিন আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম। দলিল লেখক আব্দুর রব ও আমরা একই গ্রামে বসবাস করি। আমাদের সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে দলিল লেখক আব্দুর রব মূলত প্রতারণা করেছেন। সম্ভবত এ ধরনের প্রতারণা বাংলাদেশে এই প্রথম।
জমি বিক্রেতা মো. বাবলু ও তার দুই বোন শামীমা খাতুন বলেন, আমাদের জমি কহিত গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে ফরহাদ আলীর কাছে বিক্রি করেছি। এ বিষয়ে তারা ভুক্তভোগী পরিবারকে লিখিত স্বীকারোক্তিও দিয়েছেন বলে স্বাীকার করেন।
কহিত গ্রামের প্রধান মাতব্বর হাফিজ উদ্দিন বলেন, গ্রামের প্রায় সব মানুষ জানেন কহিত তেতুলিয়া গ্রামের বাবলুদের জমি নুরুল ইসলামের ছেলে ফরহাদ আলী কিনেছেন। এখন শোনা যাচ্ছে আব্দুর রব কিনেছেন। এ নিয়ে গত সম্প্রতি গ্রামে সালিশ বৈঠক বসার কথা ছিল। আব্দুর রব অসুস্থতার কথা বলে সেখানে হাজির হয়নি। সে মূলত সময়ক্ষেপন করছে।
এ বিষয়ে মোবাইলে জানতে চাইলে দলিল লেখক মির্জা আব্দুর রব বলেন, আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা হচ্ছে। বিস্তারিত জানতে হলে এ প্রতিবেদককে তার সাথে সাক্ষাত করার কথা বলে সংযোগ কেটে দেন দলিল লেখক।
এ প্রসঙ্গে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর তাড়াশের সাব-রেজিস্ট্রারকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার সিফাত মাহমুদ বলেন, অভিযোগের বিষয়ে ইউএনও মহোদয় আমাকে অবগত করেছেন। উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, অভিযোগটি পাওয়ার পর এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহনের জেলা রেজিস্ট্রারকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা রেজিস্ট্রার শরীফ তোরাফ হোসেন বলেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাই-পূর্বক বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।