নির্মাণকাজ প্রায় শেষ। কাজের বাস্তব অগ্রগতি ৯৯.৯১ শতাংশ। টার্মিনাল ভবনও প্রস্তুত। এরই মধ্যে একবার হয়েছে ‘সফট ওপেনিং’। কিন্তু তিন বছরেও পূর্ণাঙ্গ চালু করা যায়নি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল। উল্টো প্রায় শতভাগ কাজ শেষ হওয়ার পরও নতুন করে আরো ৯০২ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদও বাড়ানো হচ্ছে আরো এক বছর। এতে ১৩ হাজার ৬১০ কোটি টাকার প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ২২ হাজার ২৬৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। আর ছয় বছরের প্রকল্পের মেয়াদ গড়াচ্ছে প্রায় ১১ বছরে।
দেশের এভিয়েশন খাতকে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে ২০১৭ সালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের প্রথম পর্যায় অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা হয় তৃতীয় টার্মিনাল। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৩ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। বাস্তবায়নের সময়সীমা ছিল ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। প্রথম সংশোধনীতে মেয়াদ তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়।
এরপর দ্বিতীয় দফায় আরো এক বছর বাড়িয়ে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু আবারও এক বছর বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রকল্প কাজের বাস্তব অগ্রগতি ৯৯.৯১ শতাংশ। বাকি আছে ১ শতাংশেরও কম কাজ। অথচ এই কাজ শেষ করতে নতুন করে সময় ও অর্থ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) প্রকল্পটির তৃতীয় সংশোধনী প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে। সেখানে ব্যয় আরো ৯০২ কোটি টাকা বাড়িয়ে ২২ হাজার ২৬৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াচ্ছে আট হাজার ৬৫৭ কোটি ১৯ লাখ টাকা।
সময় ও ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি টার্মিনাল চালু নিয়েও তৈরি হয়েছে দীর্ঘসূত্রতা। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তৃতীয় টার্মিনালের ‘সফট ওপেনিং’ করেছিলেন। তখন বলা হয়েছিল, পর্যায়ক্রমে টার্মিনালের কার্যক্রম শুরু হবে। কিন্তু এরপর প্রায় তিন বছর পার হতে চললেও টার্মিনালের পূর্ণাঙ্গ অপারেশন শুরু করা যায়নি। এখন নতুন করে চলতি বছরের আগামী ১৬ ডিসেম্বর আবারও ‘সফট ওপেনিং’ করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত। টার্মিনাল পরিচালনার জন্য জাপানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সেপ্টেম্বরে চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
টার্মিনাল ভবন নির্মাণ শেষ হলেও অপারেটর নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতার মাশুলও দিতে হচ্ছে সরকারকে। তৃতীয় সংশোধনীতে রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ৬৬৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। অপারেটর নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত এই অর্থ ব্যয় করা হবে। তবে মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে রক্ষণাবেক্ষণ খাতে এমন বরাদ্দ ছিল না। ফলে প্রকল্পের শেষ পর্যায়ে এসে নতুন এই ব্যয় যুক্ত হয়েছে।
সম্প্রতি জাপানি প্রতিষ্ঠান সাব ওয়ার্কিং গ্রুপ টার্মিনাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রস্তাব জমা দিয়েছে। গত ২৫ আগস্ট বেবিচকের সদর দপ্তরে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিরা কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব জমা দেন। এখন প্রস্তাবগুলো মূল্যায়নের পর আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে চুক্তির প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে প্রকল্পের বিভিন্ন কাজের ব্যয়ও শেষ পর্যায়ে এসে বাড়ছে। সিভিল ওয়ার্কসের আওতায় রানওয়ে ও ট্যাক্সিওয়ে সংক্রান্ত অবকাঠামোতে ৬৪৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা এবং বিল্ডিং ওয়ার্কসে ৩৭২ কোটি ৯৪ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি পরামর্শক সেবার মেয়াদ (৩৫৯ জন-মাস) বাড়িয়ে অতিরিক্ত ৪১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে গত ২০ আগস্ট পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায় এসব ব্যয় কমানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে ঠিকাদারের দাবির নিষ্পত্তিতে বিপুল অর্থ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে। প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়ামের (এডিসি) বিভিন্ন দাবি নিয়ে বেবিচকের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়। বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য ডিসপুট বোর্ড গঠন করা হয়। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ঠিকাদারের দাবির বিষয়ে বোর্ড রায় দেয়। পরে ঠিকাদারের বিভিন্ন পাওনা নিষ্পত্তিতে গত ৭ এপ্রিল ‘অমিকেবল/গ্লোবাল সেটলমেন্ট কমিটি’ গঠন করা হয়। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত এক হাজার ৫২২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ডিসপুট বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এক হাজার ৫৭৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা বকেয়া বিল এবং ৪৭ কোটি টাকা জরিমানা পরিশোধের বিষয়ও সামনে আসে। প্রকল্পের নকশা, কাজের পরিধি ও বিভিন্ন পণ্যের বিষয়ে শুরু থেকেই অস্পষ্টতা ও পরিবর্তনের অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে প্রকল্পের ব্যয় শেষ পর্যায়ে এসে বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিমত।
প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। অডিটে অতিরিক্ত বরাদ্দ, ভ্যাট, পণ্য খালাস, পরিবহন ব্যয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে আপত্তি উঠেছে। তরল কাদামাটি শুকানোর ক্ষেত্রে দুই দফা পরিবহন ব্যয় দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। এনবিআরের ভ্যাটের বিপরীতে ঠিকাদারের দাবির বিষয়েও অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বন্দরে মালপত্র খালাসের ৬৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা ব্যয়ও ঠিকাদারের পরিবর্তে রাষ্ট্রের ওপর চাপানোর বিষয়টি অডিটে উঠে এসেছে।
শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়, প্রকল্পের কারিগরি দিক নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশন সিস্টেমের মেশিনে ত্রুটি ধরা পড়েছে। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর মেশিনগুলো পুনরায় চালু হতে প্রায় ২০ মিনিট সময় নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। টেন্ডারের সময় ইউপিএসের নির্দিষ্ট লোড ক্যালকুলেশন ও কনফিগারেশন না থাকায় ব্যাকআপ পাওয়ার ব্যবস্থাপনায়ও সমস্যা তৈরি হয়েছে। ইলেকট্রনিক সিস্টেমের জন্য নির্মিত ডাক্ট ব্যাংকে পানি ও কাদা ঢোকার ঘটনাও ঘটেছে। স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ না করার অভিযোগও উঠেছে।
এতসব অনিয়ম ও প্রশ্নের মধ্যেই প্রকল্পটির ১২১টি অডিট আপত্তি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। প্রকল্প বাস্তবায়নে তদারকির দুর্বলতা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন অসংগতির কারণে এসব আপত্তি তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উঠে এসেছে। দ্রুত অডিট আপত্তিগুলো নিষ্পত্তির তাগিদ দিয়েছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিমান যোগাযোগ ও অর্থনীতির জন্য তৃতীয় টার্মিনাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও আন্তর্জাতিক মানের যাত্রীসেবা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও দীর্ঘ সময়েও এর পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু না হওয়া হতাশাজনক।
সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ