প্রথম দেখায় তার পোশাক-পরিচ্ছদ, চলাফেরা ও জীবনযাপন দেখে অনেকেরই মনে হতে পারে, তিনি হয়তো কোনো ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। তবে তার পারিবারিক জীবনের গল্প ভিন্ন। রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার একটি নিম্নবিত্ত পরিবারে চার বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে বেড়ে ওঠা আফরিন সুলতানা লাবনী বর্তমানে তিনি ‘প্রিয়মনি’ নামে পরিচিত। অল্প সময়ের ব্যবধানে তার জীবনযাত্রার পরিবর্তন, রাজনৈতিক পরিচিতি এবং বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক ঘিরে নানা অভিযোগ ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
লাবনীর শৈশব-কৈশোর কেটেছে পাংশাতেই। উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় পরবর্তীতে তিনি ঢাকায় আসেন এবং ইডেন কলেজে পড়াশোনা শুরু করেন। সেখানে জামালপুরের আতিক নামের এক যুবকের সঙ্গে তার পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে সেই সম্পর্ক বিয়েতে রূপ নেয়। তবে বিয়ের পরও থেমে থাকেনি তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা। ঢাকার রাজনৈতিক অঙ্গনে চলাফেরা এবং ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে তার পরিচয়। ‘লাবনী’ নামের পাশাপাশি তিনি ‘প্রিয়মনি’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিতি
রাজনৈতিক অঙ্গনে তার পরিচিতি তৈরির ক্ষেত্রে রাজবাড়ী জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের ভূমিকার কথা বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে। তার মাধ্যমেই আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে প্রিয়মনির পরিচয় হয়। পরবর্তীতে রাজনৈতিক অঙ্গনে তার যোগাযোগ ও প্রভাব বাড়তে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, এর ধারাবাহিকতায় তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের উপ-সংস্কৃতি সম্পাদক পদ লাভ করেন।
রাজনৈতিক পরিচিতি পাওয়ার পর তার জীবনযাত্রায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি। পোশাক-পরিচ্ছদ, চলাফেরা, ইউরোপ আমেরিকা ভ্রমণ, সামাজিক যোগাযোগ এবং বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ—সবকিছুতেই তার প্রভাব ও অবস্থান দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তবে তার এই উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন অভিযোগও সামনে আসতে শুরু করে।
প্রবাসীদের টার্গেট করে প্রতারণা
একাধিক সূত্রের দাবি, প্রিয়মনি ধনী ব্যক্তি ও প্রবাসীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে পরবর্তীতে তাদের কাছ থেকে অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী হাতিয়ে নেওয়ার কৌশল অবলম্বন করতেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা অন্যান্য মাধ্যমে যোগাযোগের পর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করা হতো। এরপর ভিডিও কলে ব্যক্তিগত মুহূর্তের সুযোগ নিয়ে সেই ভিডিও কল স্ক্রিন রেকর্ড সংরক্ষণ করা হতো। পরবর্তীতে ওই ভিডিও দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করার মাধ্যমে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করেন। এছাড়াও স্বর্ণালঙ্কার, দামি মোবাইল ফোন ও গাড়িসহ বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সম্পর্ক ও অভিযোগের জেরে এখন পর্যন্ত অন্তত ১২ জন প্রবাসীর সংসারে ভাঙন নেমে এসেছে। এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য ও অভিযোগ গণমাধ্যমের হাতে এসেছে।
দাম্পত্য জীবনেও সংকট
রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিতি বাড়ার সময় প্রিয়মনির ব্যক্তিগত জীবনেও নানা টানাপোড়েন তৈরি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। ওই সময় তিনি গর্ভবতী হন এবং পরবর্তীতে গর্ভপাত করেন এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার দাম্পত্য জীবনে চরম সংকট তৈরি হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
স্বামীর করা মামলা এবং কারাভোগ
গর্ভপাতের কয়েক মাস পর স্বামী আতিকের নগদ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে লাবনী বাড়ি ছেড়ে চলে যান। পরে আতিক তার বিরুদ্ধে চুরির মামলা করেন। ওই মামলায় লাবনী জামালপুরে সাত দিন কারাভোগ করেন এবং পরবর্তীতে আপোষের মাধ্যমে জামিনে মুক্তি পান। কারাগার থেকে মুক্তির পর স্বামী আতিকের সঙ্গে তার বিচ্ছেদ ঘটে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছেন।
এই ঘটনার পরই তার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। একের পর এক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক লেনদেন, রাজনৈতিক পরিচয় এবং বিভিন্ন বিতর্ক তাকে আলোচনায় নিয়ে আসে।

‘মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ’ নিয়েও বিতর্ক
২০১৮ সালে ‘মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ’ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে নতুন করে আলোচনায় আসেন আফরিন সুলতানা লাবনী। তবে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সময় নিজের বৈবাহিক অবস্থা গোপন রাখার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এ অভিযোগের পর তাকে প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দেওয়া হয়। সে সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। ঘটনাটি তাকে ব্যাপকভাবে আলোচনায় নিয়ে আসে। এরপর বিনোদন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পরিসরে তার পরিচিতি আরও বাড়তে থাকে।
অভিযোগের বিষয়ে আফরিন সুলতানা লাবনীর (প্রিয়মনি) বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি শুটিংয়ের কাজে ব্যস্ত আছি। আপনার সঙ্গে পরে কথা বলব।”

রাজবাড়ীর একটি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে অল্প সময়ের মধ্যে রাজনৈতিক পরিচিতি, বিত্ত-বৈভব ও সামাজিক অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন—প্রিয়মনির জীবনযাত্রার এই পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।