বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৭:৪৭ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ
কালিয়াকৈরে যৌতুক দাবিতে গৃহবধূকে নির্যাতনের অভিযোগ মৌলভীবাজারে আনসার–ভিডিপির নির্বাচনী প্রস্তুতিমূলক সমাবেশ ফরিদপুর-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী দোলনকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র! প্রশ্নের মুখে নির্বাচন ভোটের অধিকার থেকে দীর্ঘকাল বঞ্চিত থেকেছি, ১২ তারিখে গণতান্ত্রিক চলার পথে যাত্রা শুরু হবে: পুতুল ইনসাফ ও সুশাসনের বাংলাদেশ গড়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছি: এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ ইনসাফ ও সুশাসনের বাংলাদেশ গড়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছি: আসিফ মাহমুদ পেশাদারিত্ব ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতের আহ্বান আনসার মহাপরিচালকের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পদক পেলেন ৪০ কোস্ট গার্ড সদস্য কুড়িগ্রামে বিভিন্ন সরকারি দফতরের কর্মচারীদের কর্মবিরতি- ভোগান্তিতে জনগণ  জয়পুরহাটে ধানের শীষের নির্বাচনী গণমিছিলে মানুষের ঢল
নোটিশ:
তথ্য ও প্রচার মন্ত্রণালয় নিবন্ধনকৃত অনলাইন নিউজ পোর্টাল দ্য পিপলস্ নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকে সারা দেশে জেলা প্রতিনিধি নিয়োগ করা হবে। মোবাইল: ০১৭১১-১১৬২৫৭, ০১৭১২-৪০৭২৮২ ' ই-মেইল : thepeopelesnews24@gmail.com

সহিষ্ণুতা সুশাসন ও সুস্থ সমাজ কি কেবল স্লোগানে বন্দি থাকবে?

অনলাইন ডেস্ক: / ৪ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
-প্রতীকী ছবি।

নির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা

আমাদের সমাজ ক্রমশ অসহিষ্ণু এবং সহিংস হয়ে উঠছে। জোর যার মুল্লুক তার এই অনিয়মই এখন যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। ভিন্নমত দমন, প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার মানসিকতা সমাজে ভয়ংকরভাবে বিস্তার লাভ করেছে। বাংলাদেশে অসহিষ্ণুতার চর্চা চলছে দীর্ঘদিন ধরেই। তবে আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনকালে অসহিষ্ণুতা ও প্রতিহিংসার রাজনীতির চরমতম রূপ দেখে বাংলাদেশ। ভিন্নমত দমনে নৃশংসতার সব সীমা অতিক্রম করে। তৎকালীন সরকারের সমালোচনা করলেই গুম করা হতো। সম্প্রতি প্রকাশিত গুম কমিশনের রিপোর্টে এ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। শুধু সরকারের সমালোচনা নয়, সরকারের পাইক পেয়াদাদের সমালোচনাও ছিল নিষিদ্ধ। তাদের সীমাহীন দুর্নীতি ও অনিয়মের সংবাদ প্রকাশ করলেই আক্রান্ত হতো গণমাধ্যম। আওয়ামী লীগের শাসনামলে প্রচণ্ড ক্ষমতাবান ছিলেন পুলিশের সাবেক আইজি বেনজীর আহমেদ। সরকারি পদে থেকে তিনি গড়েছিলেন সম্পদের পাহাড়। তার অবৈধ সম্পদের ওপর কালের কণ্ঠ একটি সাড়া জাগানো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই রিপোর্টের পর বসুন্ধরা গ্রুপের বিরুদ্ধে আটটি মামলা করা হয়। এসব মামলার কোনো ভিত্তি ছিল না। শুধু হয়রানি করার জন্যই এসব মামলা করা হয়েছিল। এরকম উদাহরণ অনেক। শুধু মামলা নয়, তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সমাজমাধ্যমে সমালোচনাও সহ্য করা হতো না। এ ধরনের সমালোচনা করলে নেমে আসতো অত্যাচার ও নির্যাতন। অনেকেই এদের সমালোচনা করে জেলে গেছেন, কেউ গুম হয়েছেন আবার কাউকে হত্যা করা হয়েছে। এভাবেই সমাজ হয়ে ওঠে অসহিষ্ণু।

সারা দেশে মাদকের বিস্তার ঘটেছে। বিগত শাসনকালে শাসক দলের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠে মাদক সিন্ডিকেট। প্রতিটি এলাকায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠে সন্ত্রাসী বাহিনী। ৫ আগস্ট জনগণ এসব সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। পতন ঘটে ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের। নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বুকে ধারণ করে এদেশের জনগণ সেদিন পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছিল। কিন্তু নতুন বাংলাদেশ কি জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছে? না, পারেনি। সমাজে অস্থিরতা কমেনি। মানুষের জীবন নিরাপদ হয়নি। বরং নতুন করে শুরু হওয়া মব সন্ত্রাসের কাছে জিম্মি দেশের মানুষ। কিশোর গ্যাংয়ের দাপট বেড়েছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে উঠেছে নতুন সন্ত্রাসী বাহিনী। সমাজ হয়ে উঠেছে আরও ভয়ংকর অসহিষ্ণু। মতের না মিললেই হামলার শিকার হচ্ছে গণমাধ্যম। জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে গণমাধ্যম অফিস। সমাজে শুরু হয়েছে গণপিটুনির মতো মধ্যযুগীয় বর্বরতা। কিছু নব্য ক্ষমতাবানদের কাছে জিম্মি দেশের মানুষ। এরকম একটি বাস্তবতার মধ্যে দেশে নির্বাচন হচ্ছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করবে। নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান কাজ হবে সামাজিক অস্থিরতা কমানো। মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা। এটা করার জন্য দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই সরকারকে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-

১. মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি গ্রহণ করতে হবে। যে বা যারাই মব করুক তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আইন কোনো অবস্থাতেই নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না।

২. মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। মুক্তচিন্তার পথ উন্মুক্ত করতে হবে। সমাজ থেকে ভয়ের সংস্কৃতি ধীরে ধীরে দূর করতে হবে। ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

৩. বদলাতে হবে রাজনীতির ভাষা। সমাজে অসহিষ্ণুতার বড় উৎস হলো রাজনীতির ভাষা ও আচরণ। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। নির্বাচনের সময় এই প্রবণতা আরও তীব্র হয়। নেতাদের উসকানিমূলক বক্তব্য মাঠপর্যায়ে সহিংসতার জন্ম দেয়, যার খেসারত দেয় সাধারণ মানুষ। এবারের নির্বাচনেও আমরা এই প্রবণতা লক্ষ্য করছি। নতুন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হওয়া উচিত রাজনৈতিক ভাষা সংযত করা। ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব যদি বিরোধী মতকে সহ্য করার বার্তা দেয়, প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে সরে আসার ঘোষণা দেয়, তাহলে তার প্রভাব সমাজের নিচের স্তর পর্যন্ত পৌঁছায়। রাজনীতি যখন সহনশীল হয়, সমাজও তখন ধীরে ধীরে শান্ত হয়।

৪. বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে দেশকে। বাংলাদেশে সহিংসতা ও অসহিষ্ণুতা টিকে থাকার প্রধান কারণ বিচারহীনতার সংস্কৃতি। মানুষ যখন দেখে, রাজনৈতিক পরিচয় থাকলে অপরাধ করেও পার পাওয়া যায়, তখন সহিংসতা একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে ওঠে। নতুন সরকার যদি সত্যিই এই চক্র ভাঙতে চায়, তাহলে তাকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে- অপরাধীর কোনো দল নেই। রাজনৈতিক হামলা, সংখ্যালঘু নির্যাতন, ভাঙচুর বা প্রতিশোধমূলক সহিংসতার ক্ষেত্রে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করতে হবে। শুধু মামলা দায়ের নয়, বিচার ও শাস্তির দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া সমাজে ভয় দূর হয় না।

৫. সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নতুন সরকারের উচিত হবে সংখ্যালঘু নিরাপত্তাকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আগাম নিরাপত্তা ব্যবস্থা, হামলার পর দ্রুত পুনর্বাসন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে এই ধরনের ঘটনা অস্বীকার বা ছোট করে দেখার প্রবণতা পরিহার করতে হবে। রাষ্ট্র যদি স্পষ্টভাবে ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়ায়, তবে সমাজে আস্থার পরিবেশ তৈরি হয়।

৬. মনোবল ফিরিয়ে আনতে হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। ২০২৪-এর পাঁচ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা উদ্যমহীন, আতংকিত। তাদের মনোবল ভেঙে গেছে। এই মনোবল ফিরিয়ে আনা হবে নতুন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, তবে সেটি হতে হবে পেশাদার ও নিরপেক্ষ। রাজনৈতিক চাপ বা পক্ষপাতমূলক আচরণ বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে। নতুন সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে বাহিনী আইন অনুযায়ী কাজ করবে, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করবে না এবং মানবাধিকার রক্ষা করবে। বাহিনীর ভিতরে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা বাড়াতে না পারলে সহিংসতা সাময়িকভাবে দমন করা গেলেও স্থায়ী শান্তি আসবে না।

৭. গুজব এবং তথ্য সন্ত্রাস প্রতিরোধ করতে হবে। আজকের বাংলাদেশে অসহিষ্ণুতার বড় অংশ জন্ম নিচ্ছে গুজব ও ভুয়া তথ্য থেকে, বিশেষ করে সমাজমাধ্যমে। ধর্মীয় অনুভূতি, রাজনৈতিক পরিচয় বা জাতিগত বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে মুহূর্তের মধ্যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে। নতুন সরকারের করণীয় হবে গুজব মোকাবিলায় দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য দেওয়া। একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করে ঘৃণামূলক প্রচার ঠেকাতে হবে। কণ্ঠরোধ নয়, সত্যের প্রচারই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের লক্ষ্য। পাশাপাশি নাগরিকদের ডিজিটাল সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

৮. সংলাপের রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে হবে। যেখানে সংলাপ নেই, সেখানে সংঘাত অনিবার্য। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে সংলাপের সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। নতুন সরকার যদি বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ ও সামাজিক নেতৃত্বের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও আলোচনার উদ্যোগ নেয়, তাহলে রাজনৈতিক উত্তেজনা অনেকটাই প্রশমিত হতে পারে।

ভিন্নমতকে রাষ্ট্রবিরোধিতা হিসেবে না দেখে গণতন্ত্রের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা নতুন সরকারের পরিপক্বতার পরিচয় হবে। সংলাপ সহিংসতার বিকল্প, আর সমঝোতা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি।

৯. শিক্ষাঙ্গনে ফিরিয়ে আনতে হবে তরুণদের। ২৪-এর পাঁচ আগস্টের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার পরিবেশ নেই। বিরাজ করছে অস্থিরতা। শিক্ষার্থীদের মধ্যে উগ্রতা ও সহিংসতার প্রবণতা বাড়ছে। নির্বাচিত সরকারের কাজ হবে, শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমে ফিরিয়ে আনা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে দ্রুত।

১০. মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে হবে। বাংলাদেশের সামাজিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ হলো মাদকের অবাধ বিস্তার। মাদক চক্রের সঙ্গে সবসময় ক্ষমতাসীনদের সম্পৃক্ততা থাকে। এই চেইন ভেঙে ফেলতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি থেকে শুরু করে সরকারি, বেসরকারি সকল চাকরিতে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে মাদক থেকে দূরে রাখতে না পারলে বাংলাদেশ নিয়ে কোনো স্বপ্নই পূরণ হবে না। তরুণ প্রজন্ম যদি সহনশীলতার চর্চায় বড় হয়, তাহলে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ আরও শান্ত ও স্থিতিশীল হবে। নির্বাচনের পর নতুন সরকারের সামনে সমাজে অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতা বন্ধ করা এক কঠিন পরীক্ষা। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে শুধু শক্ত হাতে শাসন নয়, প্রয়োজন ন্যায়বিচার, সংলাপ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

শান্ত সমাজ কোনো একক সিদ্ধান্তে তৈরি হয় না; এটি গড়ে ওঠে রাষ্ট্রের আচরণ, রাজনীতির ভাষা এবং নাগরিকের আস্থার ওপর ভর করে। নতুন সরকার যদি সত্যিই একটি সহনশীল বাংলাদেশ গড়তে চায়, তাহলে তাকে ক্ষমতার প্রদর্শনের চেয়ে ন্যায় ও মানবিকতার পথেই হাঁটতে হবে। কারণ ইতিহাস বলে, সহিংসতা দিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখা যায়, কিন্তু শান্তি ও ঐক্য ছাড়া একটি জাতি কখনো এগিয়ে যেতে পারে না।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর