‘বড় ছল গেছে সাত বছর হচ্ছে, আর মেজো ছল গেছে দুই বছর। কোনদিনও ছুটিতে আসেনি। ছলটা বলে— ‘মা, কষ্ট করে খেয়ে দেনা শোধ করছি কেবল। বাড়ির কাজটা শুরু করছি, বাড়ি এসে বিল্ডিংয়ের কাজটা শেষ করবো। হামার বাবার আর বাড়ি আসা হলো না। কি সর্বনাশ হলো বাবা হামার।’ এভাবেই আহাজারি করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন নিহত সুমন এবং মোহনের মা ময়না বিবি।
সোমবার (১০ আগস্ট) সকালে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার গন্ডগোহালী গ্রামে মোহন এবং সুমনদের বাড়িতে শোকের মাতম বিরাজ করছে। এর আগে গতকাল রবিবার দুপুর ২টার সৌদি আরবের রিয়াদের শিফা থানা এলাকার একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে দুই ভাই নিহত হন। এছাড়া এই গ্রামের আরও দুইজন এই ঘটনায় নিহত হয়েছেন। মোট একই উপজেলার ১৩জন নিহত হয়েছেন।
নিহতরা হলেন- পারকাসুন্দা গ্রামের মৃত তমেজ উদ্দিনের ছেলে জালাল উদ্দিন (৩৮), ডুবাই গ্রামের বাদলের ছেলে সুমন হোসেন (৩৩), সোহেল রানা (পিতা-অজ্ঞাত) (৪১) ও একই গ্রামের চঞ্চলের ছেলে হাসিবুল হাসান শুভ (২৮), গন্ডগোহালী গ্রামের গফফার প্রামাণিকের ছেলে মহন প্রামানিক (৩৮) ও সুমন প্রামানিক (২৮), একই গ্রামের জান্নাত আলীর ছেলে রুবেল হোসেন (২৮), ফজলুর প্রামানিকের ছেলে কলিম উদ্দিন প্রামানিক (১৯), সাতনগর গ্রামের সাগর হোসেন (২১), উদনপৈ গ্রামের ময়েন শেখের ছেলে ফরিদ শেখ (৩৬), মাদবপুর গ্রামের মজনু মিয়ার ছেলে মজিদুল ইসলাম (৩৫), মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ হোসেন (২১), খরসতি গ্রামের মহিদুল ইসলাম (৩৯)।
নিহত সুমন এবং মোহনের মা ময়না বিবি বলেন, কালকে মেজো ব্যাটার সাথে সকালে কথা কইছি। ভালোই আছি মা, তুমি ভাত খাও। তুমি সুস্থ থাকো। যখন আগুন লাগছে, তখন ওই ফায়ার সার্ভিস আসছিলো না। তখন ছাওয়াল ভয়েস ম্যাসেজ দিছে। দিয়ে বলে ‘মারো, দুইডা কথা কমু মা, আমি আর কথা কমু না নে মা। আগুন লেগে পুড়ে যাচ্ছি মা, মরে যাচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, হামার দুই বাবা হামার বুকে এনে দেও বাবা। আমার বাবাদেরকে দেখে আমি কলিজা শান্তি করমু বাবা। বড় কষ্টের ছাওয়াল, আমার দুই ধনক আমার বুকে এনে দে বাবা রে…। মোহন বলতেছিলো — ‘এসে বিয়া করমু মা— মেয়া-টিয়ে দেখো না, আমি ১০টা দেখে একটা বিয়ে করমু মা।’
স্থানীয়রা জানায়, আত্রাই উপজেলার পারকাসুন্দা, ডুবাই, সাধনগরসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে মারা গেছেন ১৩ জন যুবক। যারা সবাই সৌদি আরবের রিয়াদের একটি সোফা তৈরীর কারখানায় কাজ করতেন। প্রতিবেশি আর স্বজনদের দাবি, দ্রুতই ফিরিয়ে আনা হোক মরদেহগুলো।
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, আগুনে পুড়ে আত্রাই উপজেলার এখন পর্যন্ত ১৩জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। নিহতদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। মরদেহ ফিরিয়ে আনতে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। এদিকে একই কারখানায় কর্মরত নাটোরের ৩ যুবকও নিহত হয়েছেন বলে জানান তিনি।