জয়পুরহাটে সংকটে জিআই পণ্য লতিরাজ কচু চাষিরা। ২০১৭ সাল নাগাদ জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও জেলায় বাণিজ্যিকভাবে এই লতিরাজ কচু বেচাকেনার বিক্রয় কেন্দ্র কিংবা বড় রকমের কোন হাট-বাজার এখনো গড়ে না উঠেনি কারনে জেলার কৃষিভিত্তিক এই ব্র্যান্ডিং পণ্য বাণিজ্যিক ভাবে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানির অপার সম্ভাবনা থাকা শর্তেও তা নানা সমস্যা-সংকটে আটকে আছে।
স্থানীয় লতি চাষিদের দাবি, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে জেলায় লতিরাজ কচু কেনাবেচার নিদিষ্ট হাট-বাজার গড়ে উঠলে জেলায় লতিরাজ কচু চাষে উদ্বুদ্ধ হবেন আরও কৃষকেরা। অল্প খরচে বেশি লাভজনক হওয়ায় দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এই কৃষি পণ্য। লতিরাজ কচু জেলার ব্র্যান্ডিং পণ্য হলেও বেশিরভাগ চাষাবাদ হয় জেলার পাঁচবিবি উপজেলায় এবং অস্থায়ী ভাবে গড়ে উঠা একমাত্র লতিরাজ কচুর হাট পাঁচবিবির বটতলীতে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র বলছেন, চলতি চাষ মৌসুমে জেলার পাঁচ উপজেলার বিভিন্ন মাঠে প্রায় ১২০৯ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়েছে লতিরাজ কচু ।
জেলা কৃষি বিভাগ বলছেন,পাঁচবিবির কচুর লতির গুণগত মান ভালো হওয়ায় স্থানীয বাজার ছাড়াও দেশের বিভিন্ন বাজারেও এর চাহিদা রয়েছে যথেষ্ট। আধুনিক বাজার ব্যবস্থাপনায় পাইকারের সাথে সরাসরি কৃষকের সংযোগ, সংরক্ষণ এবং পরিবহনের সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এই কৃষিপণ্যকে ঘিরে তৈরি হতে পারে আরও সম্ভাবনাময় বড় বাজার।
জেলার কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন,কচুর লতিকে শুধুমাত্র স্থানীয় বাজারের পণ্য হিসেবে না দেখে একে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন ও বাজারজাতের উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। কৃষকদের ‘সময়োপযোগী’ প্রশিক্ষণ, উন্নত জাতের চারা, সহজ শর্তে ঋণ এবং ন্যায্য বাজারমূল্য নিশ্চিত করা গেলে পাঁচবিবির কচুর লতি হয়ে উঠতে পারে কৃষকের অন্যতম আয়ের উৎস। তাই নানা সংকটের মাঝেও সম্ভাবনার হাতছানি দিচ্ছে পাঁচবিবির লতি রাজ কচুর লতি। কৃষকের উৎপাদন থেকে ভোক্তার হাত পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় আনা গেলে এই কৃষিপণ্যই একদিন বদলে দিতে পারে এ জেলার কৃষি খাতকে।
স্থানীয় চাষীদের অভিযোগ, স্থানীয়ভাবে কচুর লতির চাহিদা থাকায় প্রতি বছরই বাড়ছে এর চাষাবাদ। তবে বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা,পরিবহন সংকট,সংরক্ষণের সুযোগ না থাকা এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হওয়ায় সম্ভাবনাময় এ কৃষিপণ্য থেকে একদিকে যেমন কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছেন না জেলার অনেক কৃষক তেমনি এই লতির চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন অনেকেই।
পাঁচবিবি উপজেলার পাটাবুকা গ্রামের চাষী বাবু বলেন, ‘এ বছর ১ বিঘার কিছিু বেশি জমিতে লতিরাজ কচু চাষাবাদ করেছি। ১বিঘায় কচুর চারা, সার, শ্রমিক, সেচ, কীটনাশক, আগাছা পরিষ্কার, নিয়মিত পরিচর্যা করা সহ সব মিলে খরচ হয়েছে প্রায় ৪০-৫০ হাজার টাকা। আর বিঘায় লতিরাজ কচু বিক্রি করেছেন “প্রায় ১ লক্ষ” টাকা।
তিনি আরও বলেন, ‘একদিকে যেমন অল্প খরচে বেশি লাভবান হচ্ছেন কৃষক, তেমনি অন্যদিকে বাজার ব্যবস্থাপনা ভালো না থাকায় পড়তে হচ্ছে বিড়ম্বনায়। প্রতিদিন পাঁচবিবির বটতলী এই হাট থেকে প্রায় ৪-৫টি ট্রাক লোড হয়ে এই লতি যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। বাজারে এখন প্রতি কেজি লতি বিক্রি হচ্ছে ৫০-৫২ টাকা।’
বটতলীর লতিরাজ কচুর হাটের শ্রমিক ইউসুফ আলী মন্ডল বলেন, ‘প্রতিদিন ভোরে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকেরা লতি নিয়ে এসে এই হাটে সেগুলো বিভিন্ন পাইকারের কাছে বিক্রি করেন । সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে কেনাবেচা।এরপর দূর-দূরান্তে থেকে আসা পাইকারা কৃষকের থেকে লতিরাজ কচু কিনে নিয়ে প্যাকেজিং করে ট্রাক বোঝায় করে বিভিন্ন জেলায় নিয়ে যায়।’
স্থানীয় লতিরাজ কচু ব্যবসায়ী মমিজুল ও বাবু অভিযোগ করে বলেন,‘লতিরাজ কচু জেলার ব্র্যান্ডিং পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও এখন পর্যন্ত জেলার কোথাও সরকারি-বেসরকারিভাবে কচুর লতি বেচাকেনার হাট-বাজার গড়ে ওঠেনি। পাঁচবিবির বটতলীতে আমরা ব্যবসায়ীরা স্থানীয় কৃষকদের থেকে জায়গা ভাড়া নিয়ে হাট-বাজার বসিয়েছি কিন্তু সেখানেও দিতে হচ্ছে জমা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন,‘হাটজুড়ে বহু সমস্যা ও সংকট আছে। হাটের জায়গা নেই,ব্যবসায়ীদের ভাড়া করা জায়গায় হাট বসে, খোলা আকাশের নিচে, আর রোদ বৃষ্টিতে ভিঁজে এখানে ব্যবসা করতে হয়। তাছাড়া বর্ষায় কাদা হয় এবং ময়লা ফেলার জায়গাটুকুও নেই।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মনজু আলম সরকার বলেন, অল্প খরচে বেশি লাভবান হওয়ায় দিন দিন কচুর লতি চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে জেলার এই কৃষি পণ্যকে আরও লাভজনক পর্যায় নিতে হলে স্থায়ীভাবে বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, দূর-দূরান্তে থেকে আসা পাইকারদের জন্য বিশ্রামাগার, হাটে টয়লেট ব্যবস্থা, শেড নির্মাণ ও কৃষকদের সরাসরি কচু বিক্রির সুযোগ সৃষ্টি করা এবং দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানি করা প্রয়োজন। এতে করে একদিকে যেমন কৃষকেরা লাভবান হবে, তেমনি অন্যদিকে বিদেশে রফতানির মধ্যদিয়ে সরকারি রাজস্ব বাড়বে বলেও প্রত্যাশা এই কর্মকর্তার।