শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৫১ অপরাহ্ন
নোটিশ:
তথ্য ও প্রচার মন্ত্রণালয় নিবন্ধনকৃত অনলাইন নিউজ পোর্টাল দ্য পিপলস্ নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকে সারা দেশে জেলা প্রতিনিধি নিয়োগ করা হবে। মোবাইল: ০১৭১১-১১৬২৫৭, ০১৭১২-৪০৭২৮২ ' ই-মেইল : thepeopelesnews24@gmail.com

৮ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি অনুসন্ধানাধীন পিডি এখন নেসকোর এমডি: অব্যবস্থাপনায় অচল উত্তরবঙ্গের বিদ্যুৎ সেবা

নিজস্ব প্রতিবেদক: / ৪৪ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬

​নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির (নওপাজেকো) বিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানাধীন থাকা সাবেক প্রকল্প পরিচালক (পিডি) প্রকৌশলী মশিউর রহমানকে উত্তরবঙ্গের বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (নেসকো)-র ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিতে চরম প্রশাসনিক অচলবস্থা ও গ্রাহক দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। কর্মস্থলে নিয়মিত অনুপস্থিতি, ঢাকার লিয়াজোঁ অফিস থেকে বিতর্কিত কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং পূর্ববর্তী সিন্ডিকেটের সুবিধাভোগীদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে তিনি গোটা বিতরণ ব্যবস্থাকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

​রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬টি জেলা শহর এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক উপজেলা শহরের প্রায় ২২ লাখ গ্রাহককে ৬০টি বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ এবং ইলেকট্রিক সাপ্লাই ইউনিটের মাধ্যমে জরুরি বিদ্যুৎ সেবা প্রদান করে নেসকো। তবে বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অনিয়ম, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও অদক্ষতায় এই সেবা ব্যবস্থা এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে।

নওপাজেকোর সাবেক এমডি খোরশেদ আলমের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মশিউর রহমান খুলনার দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎকেন্দ্রের পিডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রথমে খুলনা ২২৫ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং পরবর্তীতে রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক ছিলেন তিনি।

​সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই দুটি প্রকল্প বাস্তবায়নে ইপিসি (ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন) ঠিকাদার নিয়োগে চরম অনিয়ম, প্রকল্প কর্মকর্তাদের আপত্তি সত্ত্বেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অন্যায্য আর্থিক সুবিধা প্রদান, প্রভাব খাটিয়ে সাবেক এমডির নিকটাত্মীয়দের উপ-ঠিকাদার হিসেবে কাজ দেওয়া, সর্বনিম্ন দরদাতাকে পাশ কাটিয়ে সর্বোচ্চ দরদাতাকে কার্যাদেশ প্রদান এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন (আউটপুট) না পেলেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

​দুদক সূত্রে জানা গেছে, নওপাজেকোর আওতাধীন প্রকল্পগুলোতে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার লুটপাট ও অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে বর্তমানে অনুসন্ধান চালাচ্ছে সংস্থাটি। অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনায় দুদকের পরিচালক মো. আবুল হাসনাতকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দিয়ে বিভিন্ন নথিপত্র ও প্রমাণাদি তলব করেছে।

​এ বিষয়ে বিশিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম এর আগে গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, “আলোচিত এই দুই প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এর সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি দুদকও অনুসন্ধান শুরু করেছে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো বিতর্কিত কর্মকর্তাকে সরকারের শীর্ষ কোনো পদে রাখার সুযোগ নেই।” তবে বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞদের এমন স্পষ্ট সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে রহস্যজনক কারণে মশিউর রহমানকে নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে বসানো হয়।

নেসকোতে যোগদানের পর থেকেই মশিউর রহমানের বিরুদ্ধে দাপ্তরিক বিশৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগগুলো হলো, রাজশাহীর প্রধান কার্যালয়ে অনুপস্থিতি, দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম চার মাসে তিনি রাজশাহীর মূল প্রধান কার্যালয়ে মাত্র চার দিন সশরীরে উপস্থিত থেকে অফিস করেছেন। ঢাকার লিয়াজোঁ অফিস থেকে ফাইল নিষ্পত্তির চেষ্টা, রাজশাহীর বদলে ঢাকার বিজয়নগরে অবস্থিত লিয়াজোঁ অফিস থেকে তিনি কার্যক্রম পরিচালনা করেন। সেখানেও তিনি দুপুর ১২টার আগে কার্যালয়ে আসেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে জরুরি নথিপত্র ও ফাইল আটকে থাকা, মাঠ পর্যায়ের যেকোনো সিদ্ধান্তে দীর্ঘসূত্রতা এবং মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে চরম সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে। ঢাকায় প্রতি মাসে ১৫ থেকে ২০টি অপ্রয়োজনীয় বৈঠক ডেকে বোর্ড রুমের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী ও এমডি নিজে মোটা অঙ্কের বৈঠক সম্মানী (সিটিং অ্যালাউন্স) নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ভ্রমণ ও দৈনিক ভাতা (টিএ/ডিএ) অনিয়ম, কর্মস্থল রাজশাহী হওয়া সত্ত্বেও ঢাকায় অবস্থানের বিপরীতে অনৈতিকভাবে নিয়মিত ভ্রমণ ও দৈনিক ভাতা দাবি এবং উত্তোলন করার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে ঢাকা-রাজশাহী যাতায়াতে নিয়মিত সরকারি ও অফিশিয়াল বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করার পরেও একই ভ্রমণের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট ভ্রমণ ভাতা উত্তোলন করা হয়েছে। এছাড়াও প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও মালামাল ক্রয়ে দীর্ঘসূত্রতা, সাধারণ ঠিকাদারদের ন্যায্য বিল মাসের পর মাস আটকে রাখা এবং বগুড়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পছন্দের ঠিকাদার সিন্ডিকেটের সাথে গোপন আঁতাত করে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ উঠেছে, ২০১৬ সাল থেকে নেসকোতে গড়ে ওঠা আওয়ামী সিন্ডিকেটের সাবেক এমডি জাকিউল ইসলামের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এবং অডিট আপত্তি থাকা শীর্ষ প্রকৌশলীদের মাধ্যমে বর্তমান এমডি পুরো সংস্থাটি পরিচালনা করছেন। জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিয়ে প্রধান প্রকৌশলী করার অপচেষ্টাও চালানো হচ্ছে। এছাড়া বোর্ড বা গুরুত্বপূর্ণ নীতি-নির্ধারণী মিটিংয়ে বর্তমান এমডির অসচেতন ও অপেশাদার আচরণের (ঘুমিয়ে পড়া) ছবি ও তথ্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছে।

​বিদ্যুৎ খাতের গুরুত্বপূর্ণ এই বিতরণ সংস্থার স্বাভাবিক গতি ফেরাতে এবং উত্তরবঙ্গের ২২ লাখ গ্রাহকের বিদ্যুৎ সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখতে বর্তমান বিতর্কিত ও অদক্ষ এমডিকে অবিলম্বে অপসারণ করে একজন সৎ, দক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তা নিয়োগের জোর দাবি জানিয়েছেন নেসকোর প্রকৌশলী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।

​


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর