শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬, ০৬:৪৮ অপরাহ্ন
নোটিশ:
তথ্য ও প্রচার মন্ত্রণালয় নিবন্ধনকৃত অনলাইন নিউজ পোর্টাল দ্য পিপলস্ নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকে সারা দেশে জেলা প্রতিনিধি নিয়োগ করা হবে। মোবাইল: ০১৭১১-১১৬২৫৭, ০১৭১২-৪০৭২৮২ ' ই-মেইল : thepeopelesnews24@gmail.com

কোন প্রযুক্তিতে ভর করে এমন নিখুঁত হামলা করছে ইরান, চিন্তায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল

অনলাইন ডেস্ক: / ২১ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬
- সংগৃহীত ছবি

আল জাজিরার বিশ্লেষণ

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার সংঘাতে আলোচনায় উঠে আসছে চীনের উন্নত স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেম ‘বেইদু’-র নাম। গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্প্রতি ইসরায়েল এবং মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের চালানো ক্ষেপণাস্ত্র হামলাগুলো আগের তুলনায় অনেক বেশি নিখুঁত ও বিধ্বংসী হয়ে উঠেছে। ফ্রান্সের সাবেক গোয়েন্দা পরিচালক অ্যালাইন জুইলেত এক পডকাস্টে দাবি করেছেন, গত বছরের জুন মাসের যুদ্ধের তুলনায় ইরানের এই লক্ষ্যভেদী সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রধান কারণ হতে পারে চীনের এই নেভিগেশন ব্যবস্থার ব্যবহার।

২০২০ সালে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হওয়া চীনের বেইদু সিস্টেমকে দীর্ঘকাল ধরে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেমের (জিপিএস) প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বেইজিং মূলত ১৯৯৬ সালের তাইওয়ান সংকটের পর থেকেই নিজস্ব নেভিগেশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ শুরু করেছিল, যাতে যুদ্ধের সময় ওয়াশিংটন জিপিএস সেবা বন্ধ করে দিলেও তারা বিপদে না পড়ে। বর্তমানে বেইদু সিস্টেমে প্রায় ৪৫টি স্যাটেলাইট সক্রিয় রয়েছে, যেখানে মার্কিন জিপিএস ব্যবস্থায় স্যাটেলাইটের সংখ্যা মাত্র ২৪টি। এই বিপুল সংখ্যক উপগ্রহের উপস্থিতি বেইদুকে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে অধিকতর নির্ভুল তথ্য দেওয়ার সক্ষমতা দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান আগে তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য মূলত মার্কিন জিপিএস এবং নিজস্ব ‘ইনার্শিয়াল নেভিগেশন’ সিস্টেমের ওপর নির্ভর করত। তবে মার্কিন নেভিগেশন ব্যবস্থাটি সহজেই জ্যাম করা যায় অথবা সিগন্যাল বিকৃত করে ক্ষেপণাস্ত্রকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করা সম্ভব, যা গত ২০২৫ সালের ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল সফলভাবে করতে পেরেছিল। কিন্তু চীনের বেইদু সিস্টেমের সামরিক গ্রেড সিগন্যালটি জ্যামিং প্রতিরোধী এবং এতে ‘ফ্রিল্টার আউট’ প্রযুক্তি থাকায় ভুয়া স্থানাঙ্ক দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্রকে বিভ্রান্ত করা প্রায় অসম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে।

চীন-ইরান সম্পর্কের গবেষক থিও নেনচিনি জানিয়েছেন, ইরানের এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হঠাৎ করে ঘটেনি বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ। ২০১৫ সালেই ইরান চীনের সাথে বেইদু-২ সিস্টেম ব্যবহারের বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছিল। পরবর্তীতে ২০২১ সালে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি হওয়ার পর ইরান বেইদুর এনক্রিপ্টেড (গোপন সামরিক) সংকেত ব্যবহারের সুযোগ পায়। ২০২৫ সালের যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতার পর ইরান তাদের পূর্ণাঙ্গ সামরিক ও বেসামরিক কাঠামোকে বেইদু নেভিগেশনের আওতায় নিয়ে আসার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করেছে।

সামরিক বিশ্লেষক এলিজাহ ম্যাগনিয়ারের মতে, বেইদু ব্যবহারের ফলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এখন মাঝ আকাশে থাকা অবস্থাতেও তাদের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারছে। বেইদু সিস্টেমে থাকা ক্ষুদ্র বার্তা পাঠানোর সুবিধা ব্যবহার করে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূর থেকেও ড্রোন বা মিসাইলকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এর ফলে লক্ষ্যবস্তু যদি কিছুটা সরেও যায়, তবুও বেইদুর উচ্চ-নির্ভুল তথ্য ব্যবহার করে ক্ষেপণাস্ত্রটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার নিশানায় আঘাত হানতে সক্ষম হচ্ছে। বর্তমানে এই ব্যবস্থার ভুলের মাত্রা এক মিটারেরও কম, যা আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

ইরানের এই প্রযুক্তিগত উত্তরণ শুধু সামরিক নয় বরং ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মহাকাশভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যে একাধিপত্য ছিল, ইরানের এই পদক্ষেপ তা ভেঙে দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। এখন মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোও তাদের প্রতিরক্ষার জন্য শুধুমাত্র জিপিএসের ওপর নির্ভর না করে বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভাবতে শুরু করেছে। এর ফলে ওই অঞ্চলে মার্কিন প্রভাব আগের চেয়ে কিছুটা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে, এই যুদ্ধক্ষেত্রটি চীনের জন্য তাদের বেইদু সিস্টেমের সক্ষমতা যাচাইয়ের একটি বড় পরীক্ষাগার হিসেবে কাজ করছে। মার্কিন পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান যেমন এফ-৩৫-এর বিরুদ্ধে এই নেভিগেশন সিস্টেম কতটা কার্যকর এবং মার্কিন ইন্টারসেপ্টরগুলো কীভাবে কাজ করে, সেই মূল্যবান তথ্য এখন বেইজিংয়ের হাতে পৌঁছাচ্ছে। গোয়েন্দাদের ধারণা, ইরানকে এই প্রযুক্তি সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে চীন আসলে সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়েও মার্কিন সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতাগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের কাছে কত বিশাল ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ আছে, তা নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। ফ্রান্সের সাবেক গোয়েন্দা প্রধানের মতে, ফ্রান্সের চেয়ে তিনগুণ বড় আয়তনের দেশ ইরানে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ট্রাকের ওপর বহন করে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যা চিহ্নিত করা প্রায় অসম্ভব। ইরান এখন অত্যন্ত হিসাব কষে তাদের এই উন্নত প্রযুক্তি সম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ব্যবহার করছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর