হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত টিকা গ্রহণের হার কমে যাওয়া, দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, জনঘনত্ব এবং অসচেতনতার কারণে মহামারিতে রূপ নিয়ে থাকে। সম্প্রতি বাংলাদেশে হামের কারণে প্রায় শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই মৃত্যুর কারণ হিসাবে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া একটি সিদ্ধান্তকেই অন্যতম দায়ী বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে শিশুদের মাঝে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দুই দশক আগে প্রায় নির্মূল হওয়া এই রোগটি আবারও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেই অভিজ্ঞ মহল মনে করছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের প্রতিবেদনে প্ররিলক্ষিত হচ্ছে যে, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৯৫ হাজার মানুষ হামে প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের অধিকাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু। টিকার প্রাপ্যতা থাকা সত্ত্বেও টিকাদানে অনীহা ও স্বাস্থ্য কাঠামোর দুর্বলতার কারণে এই মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হয়নি। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিদিনই ভর্তি করা হচ্ছে হাম আক্রান্তদের। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, পাবনা, রাজশাহী, যশোর, খুলনা ও নাটোর জেলায় এই রোগের সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত পরীক্ষায় আক্রান্ত শিশুদের শরীরে এই ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। চিকিৎসকদের মতে, সামান্য অসচেতনতা এই রোগকে মহামারির দিকে ঠেলে দিতে পারে।
বাংলাদেশে সরকারিভাবে শিশুদের দেওয়া বিভিন্ন রোগের টিকার যে সংকট দেখা দিয়েছে, তার জন্য বিগত অন্তর্বর্তী সরকারকে দায়ী করছেন অনেকেই, অভিযোগকারীদের মধ্যে ক্ষমতাসীন সরকারী দল বিএনপির মন্ত্রী ও নেতাদের অনেকেই রয়েছেন। হাম আক্রান্ত হয়ে একের পর এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের দায় রয়েছে মন্তব্য করে ফেসবুকসহ সামাজিক বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবিও তুলেছেন দেশের সচেতন নাগরিকদের অনেকেই।
অন্যদিকে, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন, টিকা কেনার ক্ষেত্রে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বের আগের সরকারের ‘অদূরদর্শীতার’ কারণে এখন খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষকে। “অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা ক্রয়ের সিস্টেমে একটা পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। উদ্যোগটি ভালো হলেও, সেটি গ্রহণ করা হয়েছিল প্রয়োজনীয় পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই। তাদের এমন অদূরদর্শী পদক্ষেপের ফলেই টিকা কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়েছে এবং দেশের স্বাস্থ্যখাতে অবধারিতভাবে সেই সিদ্ধান্তের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এ বিষয়ে বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক স্বাক্ষাতকারে বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন এমন মন্তব্যই করেছেন।
২০২৫ সালে এসে দেখা যাচ্ছে, টিকাদানের হার ৬০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। বিসিজি টিকাদানে ঘাটতির হার ১৩ দশমিক ২ শতাংশ। দেশের খ্যাতিমান শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লার মতে, গত দেড় বছরে টিকাদান কর্মসূচির ক্ষেত্রে আগের হার বজায় রাখা হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম এমন সংক্রামক রোগ যে এর ক্ষেত্রে হার্ড ইমিউনিটি বজায় রাখতে হলে ৯৫ শতাংশের বেশি কভারেজ বা টিকাপ্রাপ্ত রোগীর হার বজায় রাখা দরকার। কভারেজ ৭০ শতাংশের নিচে নামলে প্রাদুর্ভাব প্রায় অনিবার্য। এ থেকে ধারণা করা যায়, সমস্যা ‘৮ বছর টিকা না দেওয়া’ নয়, বরং সাম্প্রতিক কভারেজে–ঘাটতির বড় কারণ সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাওয়ার ক্ষেত্রে। বিশ্লেষকদের মতে, হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। এর মধ্যে আছে কোভিড মহামারি-পরবর্তী স্বাস্থ্যসেবার ব্যাঘাত, শহরের বস্তি ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টিকাদানে ফারাক। মাইগ্রেশন ও ‘টিকা না পাওয়া’ শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি, নিয়মিত মনিটরিংয়ের ঘাটতি। এর ফলে একটি ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টে ড. ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় বসার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অপারেশনাল প্ল্যান বাতিল করা হয়। সেই সিদ্ধান্তের সরাসরি ফল হিসেবে ইপিআইয়ের টিকা কেনা বন্ধ হয়ে যায়। হাম-রুবেলা, পোলিও, যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, ডিপথেরিয়া-ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস-বি, মোট ছয় ধরনের টিকার মজুদ এখন শূন্য। জন্মের পর থেকে ১৫ মাস বয়স পর্যন্ত একটা শিশুকে যে নয় ধরনের টিকা দেওয়ার কথা, তার মধ্যে ছয়টাই নেই। এটা প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটা দ্রুত গ্রহন করা সিদ্ধান্তের পরিণতি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক নিজেই স্বীকার করেছেন, ইউনিসেফ থেকে সরাসরি কেনার বদলে অর্ধেক ওপেন টেন্ডারে কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বিকল্প কিছু না রেখেই। পরে সেই সিদ্ধান্তও পাল্টাতে হয়। এই গোলকধাঁধার মাঝে শিশুরা টিকা পায়নি, আর হাম এখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিন আক্রান্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে সাথে সাথে মৃত্যুও বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশনের স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ারপারসন ড. নিজাম উদ্দিন বলছেন, প্রায় এক বছর ধরে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তিনি এখনই মিজেলস ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইন শুরু করার কথা বলছেন। কিন্তু সেই ক্যাম্পেইন চালাবে কে? যে টিকাই নাই, তা দিয়ে ক্যাম্পেইন হবে কীভাবে?
ড. ইউনুস সরকারের দায় এখানে পরিষ্কার। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরই না ভেবেই একটা চলমান, কার্যকর স্বাস্থ্যকর্মসূচিকে ব্যাহত করার কোনো যুক্তি ছিল না। ওপি বাতিল, ক্রয় প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি, তারপর আবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন, এই পুরো প্রক্রিয়াটা দেখায় যে জনস্বাস্থ্যকে একটা প্রশাসনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাঠ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। পরীক্ষার মাশুল দিচ্ছে শিশুরা।
এমন পরিস্থিতিতে আমাদের সামনে জনস্বাস্থ্যের গুরুতর একটি সংকট হিসেবে হাজির হয়েছে। এটি কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, তা নিয়ে চিন্তা না করে বরং সেটির তুলনায় সরকার থেকে এবং নাগরিক পরিসরে শুরুতে দোষারোপের রাজনীতি দেখা যাচ্ছে। করোনা মহামারির সময়ও দেশবাসী লক্ষ্য করেছিল, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর ও অব্যবস্থাপনাপূর্ণ। আর এই সবকিছুর সঙ্গে বেরিয়ে আসে স্বাস্থ্যখাতে রাষ্ট্রযন্ত্র ও তৎকালীন সরকারের অনিয়ম ও দুর্নীতি। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দুর্নীতিগ্রস্ত দেশে স্বভাবতই এমন পরিস্থিতিতে প্রথমেই ব্যর্থতার দায়ে দায়ি করা হয় সরকারকে। বর্তমান বিএনপি সরকার একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দুমাসের মত ক্ষমতায় এসেছে। সরকার পরিচালনার শুরুতেই হামের এ প্রাদুর্ভাব তাদের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে এসেছে বলতে হবে। কিন্তু সেই পরীক্ষা দিতে গিয়ে বরাবরের মতো দায় এড়ানোর নিরাপদ অবস্থানকেই যেন বেছে নিতে চাইল তারা। শুধু দায় এড়ানো নয়, অন্যের ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়ার যে দীর্ঘ সংস্কৃতি, সেই চর্চা থেকে বেকর হতে পারে নাই। স্বাস্থ্যখাতে বড় ধরনের অব্যবস্থাপনা, অবহেলা, অনিয়ম ও জনবলসংকট পাওয়া যাচ্ছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও এর ব্যতিক্রম নয়। বিশেষ করে টিকা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি অভিযোগ জোরালোভাবেই দেখা যাচ্ছে। নাগরিক সমাজ অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী মহলও অন্তর্বর্তী সরকারকে তুলাধোনা করতে ছাড়ছে না। দোষারোপের এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে এসে আমাদের সকলকে হাম নামক এই ব্যাধি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে।
দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—এত কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুদের মৃত্যু এখনও ঘটছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন স্বাস্থ্যগত দুর্ঘটনা নয়; বরং আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং নীতিনির্ধারণের গভীর দুর্বলতার নির্মম প্রতিফলন। একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে একটি শিশুর মৃত্যু মানে শুধুই একটি প্রাণহানি নয়—এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার স্পষ্ট চিত্র। বিভিন্ন গণমাধ্যমে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের দেওয়া বক্তব্য থেকে জানা যাচ্ছে, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে হামের রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। এ বছর তা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। যাদের অবহেলা এবং অসচেতনার কারণে আমাদের ভবিষ্যৎ সম্ভবনার মৃত্যু ঘটে তাদেরকে গণহত্যাকারী হিসেবে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে এসে শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মেন করেন দেশের সচেতন সাধারণ নাগরিক। শুধু তাই নয় যারা খাদ্যে ভেজালের মাধ্যমে মানুষকে অসুস্থ বানিয়ে মৃত্যুর দিকে ধাবিত করছে তাদেরকেও দ্রুত চিহ্নিত করে শাস্তি নিশ্চিত করা অতীব জরুরী এবং সময়ের চাহিদা বলে মনে করেন।
একটি রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হলো তার নাগরিকদের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি শুধু একটি স্বাস্থ্য উদ্যোগ নয়; এটি একটি জাতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। অথচ বাস্তবতা বলছে—গ্রাম থেকে শহরের বস্তি পর্যন্ত এখনও অনেক শিশু নিয়মিত টিকার আওতার বাইরে রয়ে যাচ্ছে। কোথাও সরবরাহ ব্যবস্থার ঘাটতি, কোথাও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব, আবার কোথাও জনসচেতনতার সংকট—সব মিলিয়ে একটি দুর্বল ও ভঙ্গুর ব্যবস্থার চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের জন্যও এটি একটি বড় শিক্ষণীয় বিষয়। জনস্বাস্থ্যের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ খাতের জন্য বিদেশী সহায়তার ওপর নির্ভরশীল থাকা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, তা এই হামের প্রাদুর্ভাব চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে নজরদারি জোরদার, সংক্রমণ ক্লাস্টার তদন্ত এবং পুনরায় টিকাদান কার্যক্রম শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে হাম নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ অপরিহার্য।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিকেট জনগনের থেকে প্রত্যাশা ছিল, এই ধরনের জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলায় দ্রুত, সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ। কিন্তু হামের প্রাদুর্ভাব এবং শিশু মৃত্যুর ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দেয়, সেই প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। সংকটকালীন দ্রুত প্রতিক্রিয়া, টিকাদান কার্যক্রম জোরদার, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ নজরদারি এবং গণসচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ঘাটতি রয়ে গেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে স্বাস্থ্যখাতে যে বিশৃঙ্খলা দৃশ্যমান হয়েছে তা এক ধরনের বেহায়াপনা ছাড়া অন্য কিছুই নয়। একটি শিশুর মৃত্যু শুধুমাত্র পরিসংখ্যান হতে পারে না। এটি একটি পরিবারে শোকের ছায়া, একটি ভবিষ্যতের মৃত্যু , একটি জাতির সম্ভাবনার ক্ষতি। অথচ সরকার অনেক সময়ই এই ঘটনাগুলোকে সংখ্যা দিয়ে মাপার চেষ্টা করে থাকে, যা জাতির জন্য সবচেয়ে বড় মানসিক ব্যর্থতা। এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো জরুরি। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সুসংহত পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং কঠোর জবাবদিহিতা। টিকাদান কর্মসূচির শতভাগ বাস্তবায়ন, স্বাস্থ্যখাতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি জোরদার এবং ব্যাপক গণসচেতনতা, এসকল পদক্ষেপ গ্রহন এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি, যেসব ক্ষেত্রে ব্যর্থতা ঘটেছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায় নির্ধারণ নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ অতীতে টিকাদান কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। সময়োপযোগী পদক্ষেপ এবং সম্মিলিত সচেতনতার মাধ্যমে দেশ আবারও হাম রোগ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে সফল কর্মসূচিগুলোর একটি হলো সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি—ইপিআই। এই কর্মসূচির হাত ধরেই একসময় হাম, পোলিও, ডিপথেরিয়া, টিটেনাসসহ বহু প্রাণঘাতী রোগ নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু আজ সেই অর্জনের ভিত্তিই যেন কেঁপে উঠছে। টিকা হাতে থাকলেও সিরিঞ্জ না থাকার মতো এক অবিশ্বাস্য বাস্তবতা আমাদের সামনে হাজির হয়েছে—যা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং একটি সম্ভাব্য জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের ইঙ্গিত। দেশে হাম ছিল না বললেই চলে। সেটা ফিরে এসেছে। টিকা নেই। শিশু মরছে। আর দুই সরকার মিলিয়ে যা দাঁড়িয়েছে তা হলো, একটা সংকট তৈরি করে গেছে, আরেকটা সেটা নিয়ে নীরব বসে আছে। মাঝখানে যাদের জীবন, তারা বয়সে এত ছোট যে নিজের কথা নিজে বলতেও পারে না। একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের পরিচয় নির্ভর করে সে তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকদের, অর্থাৎ শিশুদের কতটা সুরক্ষা দিতে পারে তার উপর। হামে একটি শিশুর মৃত্যুও যেন আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়, আমাদের নীতিনির্ধারকদের জাগিয়ে তোলে এবং আমাদের সবাইকে আরও দায়িত্বশীল করে তোলে, এই প্রত্যাশাই আজ জনগনের দাবি।
[লেখক : রাজনীতিক, কলাম লেখক ও রাজনীতিক বিশ্লেষক]
E-mail : gmbhuiyan@gmail.com