যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও চলাচলের সংবেদনশীল তথ্য ফাঁসের অভিযোগ ওঠায় ইরান সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত সংবাদ সংস্থা ‘তাসনিম নিউজ এজেন্সি’র একাধিক অফিশিয়াল অ্যাকাউন্ট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার)।
বুধবার গভীর রাতে প্ল্যাটফর্মটির পক্ষ থেকে এই আকস্মিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এর ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স থেকে তাসনিম নিউজের ইংরেজি, ফারসি ও আরবি ভাষার প্রধান অ্যাকাউন্টগুলো সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। বর্তমানে এই অ্যাকাউন্টগুলোতে প্রবেশের চেষ্টা করলে এক্স ব্যবহারকারীদের উদ্দেশ্যে বার্তা দেখাচ্ছে, ‘অ্যাকাউন্ট স্থগিত করা হয়েছে। এক্স-এর নীতি ও নিয়ম লঙ্ঘনকারী অ্যাকাউন্টগুলোকে স্থগিত করে এক্স।’
যদিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স ঠিক কোন নির্দিষ্ট নীতি লঙ্ঘনের কারণে এই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, তা আনুষ্ঠানিকভাবে খোলাসা করেনি। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদন এবং স্বতন্ত্র নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটি সম্প্রতি এমন একটি ভিডিও ক্লিপ প্রকাশ করেছিল যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। অভিযোগ উঠে এসেছে, ভিডিওটিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের চলাচলের গোপনীয় রুট এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তাব্যবস্থার বেশ কিছু সংবেদনশীল ত্রুটি বা দুর্বলতার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের স্পর্শকাতর তথ্যকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে কিংবা কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে ব্যবহার করার মতো চরম ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছিল।
উল্লেখ্য, বর্তমান ও সাবেক মার্কিন সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর ইরান-সম্পর্কিত বিভিন্ন হুমকি নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই সতর্কবার্তা দিয়ে আসছে।
তাসনিম নিউজের বিরুদ্ধে নেওয়া এই ব্যবস্থার ফলে তেহরান সরকারের একটি অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের উপস্থিতি হারাল। ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই গণমাধ্যমটি নিজেদেরকে পশ্চিমা গণমাধ্যমের একপাক্ষিক বর্ণনার বিরুদ্ধে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের রক্ষক হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকে। তবে পশ্চিমারা মনে করে, এই সংবাদ সংস্থাটির সঙ্গে ইরানের শক্তিশালী সামরিক সংস্থা ‘ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস’ বা আইআরজিসির অত্যন্ত সুগভীর যোগসূত্র রয়েছে।
উল্লেখ্য, আইআরজিসিকে ২০১৯ সালে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এর আগেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত বিধিমালা অনুযায়ী তাসনিম নিউজসহ একাধিক ইরানি রাষ্ট্রায়ত্ত অ্যাকাউন্টের ভেরিফায়েড ব্যাজ বা টিকচিহ্ন সরিয়ে নিয়েছিল এক্স কর্তৃপক্ষ।
বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যখন ইরানি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমগুলোর ওপর কড়া নজরদারি চালাচ্ছে, ঠিক সেই প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপটি কার্যকর করা হলো। মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যখনই ইরানের রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ কোনো গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, তখনই তেহরানের পক্ষ থেকে এটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সেন্সরশিপ বলে তীব্র সমালোচনা করা হয়। আগের বিভিন্ন ঘটনার ক্ষেত্রেও দেখা গেছে যে, পশ্চিমের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণের অভিযোগ তুলে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে ইরান সরকার।
অন্যদিকে এটিও একটি বাস্তবতা যে, ২০০৯ সাল থেকেই খোদ ইরানের ভেতরে সাধারণ নাগরিকদের জন্য এক্স, ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামের মতো প্রধান প্রধান আন্তর্জাতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে প্রবেশাধিকার সীমাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। ফলে বর্তমানে কোটি কোটি ইরানি নাগরিক ভিপিএন বা ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সরকারের এই ব্লক এড়ানোর চেষ্টা করেন।
স্থগিত হওয়া এই অ্যাকাউন্টগুলো স্থায়ীভাবে বাতিল করা হবে নাকি পর্যালোচনার পর পুনরায় ফিরিয়ে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে এক্স-এর নিরাপত্তা দল এখনো কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
সূত্র: ফার্স্টপোস্ট