ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলে হুতি বিদ্রোহীদের বিভিন্ন অবস্থানে বিমান হামলা চালিয়েছে দেশটির বিমানবাহিনী। শুক্রবার ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, মোখা ও ধুবাব এলাকায় হুতিদের সামরিক অবস্থান, যানবাহন ও অস্ত্রের মজুত লক্ষ্য করে এসব হামলা চালানো হয়।
ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনীর সরকারি মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজিদ আবদুল্লাহ আল-নুজাইলি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, মোখা বন্দরের কাছে এবং মোখা শহরের জায়েদ আল-খারজ বিপণিবিতানের আশপাশে হুতিদের লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। এসব হামলায় বেশ কয়েকটি যানবাহন ও অস্ত্র ধ্বংস এবং হুতি মিলিশিয়ার সদস্যরা নিহত হয়েছেন।
আল-নুজাইলির দাবি, মোখা শহরের পানি প্রকল্প প্রশাসনের পাশেও হুতি সদস্যদের একটি অবস্থানে হামলা চালানো হয়। একই সঙ্গে মোখা-ধুবাব সড়কের একটি পশু কোয়ারেন্টাইন কেন্দ্রের কাছে জড়ো হওয়া হুতিদের যানবাহন ও যোদ্ধাদের লক্ষ্য করেও হামলা চালানো হয়েছে।
ওই স্থানটি মোখা শহর থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার (৭ মাইল) দূরে বলে জানান তিনি।
ইয়েমেনি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র আরও বলেন, মোখার উত্তর রিং রোডে এক সাবেক সামরিক কমান্ডারের পুরোনো সদর দফতরেও হুতি সদস্যদের একটি সমাবেশ লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। তার দাবি, এসব হামলায় হুতিদের বেশ কয়েকটি অবস্থান ও সমাবেশ ধ্বংস করা হয়েছে।
তবে হামলায় মোট কতজন নিহত বা আহত হয়েছেন, কিংবা ধ্বংস হওয়া সামরিক সরঞ্জামের পরিমাণ কত—এসব বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। হুতিদের পক্ষ থেকেও হামলা ও হতাহতের বিষয়ে কোনও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
কয়েক বছর পর ইয়েমেনে ফের উত্তেজনা
ইয়েমেনে সাম্প্রতিক এই বিমান হামলা দেশটির দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়েছে। ২০১৪ সালে ইরান-সমর্থিত হুতিরা রাজধানী সানা ও দেশের বড় একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।
পরবর্তীতে হুতিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেন সরকারের পক্ষে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন একটি সামরিক জোট যুদ্ধে নামে। প্রায় ১২ বছর ধরে চলা এই সংঘাতে বিপুল প্রাণহানি ও মানবিক সংকট তৈরি হয়।
২০২২ সালের পর থেকে সংঘাতের তীব্রতা তুলনামূলকভাবে কমে আসে এবং দেশটির বিভিন্ন এলাকায় এক ধরনের আপেক্ষিক শান্তি বজায় ছিল। তবে রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে সংঘাতের স্থায়ী সমাধান এখনও সম্ভব হয়নি।
গাজা যুদ্ধের পর আঞ্চলিক সংঘাতে হুতিদের ভূমিকা
২০২৩ সালের শেষদিকে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইয়েমেনের হুতিরা বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে আরও সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়ে।
হুতিরা ইসরায়েলের ভূখণ্ডের পাশাপাশি লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করে। তাদের দাবি ছিল, গাজায় ইসরায়েলের হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজ ও স্বার্থের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে।
এর ফলে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবাণিজ্যপথ হওয়ায় এই অঞ্চলে হুতিদের হামলা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা হুতিদের হামলার জবাবে ইয়েমেনে বিভিন্ন স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এতে দেশটির সংঘাত আবারও আঞ্চলিক উত্তেজনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে।
পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ ফিরে আসার আশঙ্কা
ইয়েমেনে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে লড়াই ও বিমান হামলা বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশটিতে ২০২২ সালের পর তৈরি হওয়া আপেক্ষিক শান্তি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে চলা যুদ্ধের কারণে ইয়েমেন ইতোমধ্যে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটে পড়েছে। সংঘাত নতুন করে পূর্ণমাত্রায় ছড়িয়ে পড়লে বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব আরও গুরুতর হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
মোখা ও ধুবাবের মতো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় এলাকায় সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের পাশাপাশি লোহিত সাগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও নতুন করে আলোচনায় আসতে পারে। ফলে হুতি ও ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর মধ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা কোন দিকে গড়ায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি