মোবাইল ফোনের পর্দায় কয়েকটি ক্লিক, সঙ্গে বড় অঙ্কের টাকা জেতার হাতছানি। দ্রুত ধনী হওয়ার এই স্বপ্ন দেখিয়ে মেহেরপুরে বিস্তার ঘটছে অনলাইন জুয়ার। তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জড়িয়ে পড়ছেন এই ভয়ংকর ফাঁদে। অনলাইন জুয়ার এজেন্টরা রাতারাতি কোটি টাকার মালিক বনে গেলেও নিঃস্ব হচ্ছেন তরুণ-তরুণীসহ সাধারণ মানুষ।
অনলাইন জুয়ার এই কারবার ঘিরে মেহেরপুরে গড়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ একটি নেটওয়ার্ক। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার ছত্রছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্মের হয়ে কাজ করছে স্থানীয় এজেন্ট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের একটি চক্র। সাবেক জনপ্রশাসন মন্ত্রীর পত্নী মনালিসা, পতিত আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী একাধিক নেতা এবং প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত—এমন অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বিভিন্ন সময়ে অনলাইন জুয়ার ছোটখাটো এজেন্টরা আটক হলেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ কারণে এজেন্ট পরিবর্তন হলেও থামছে না অনলাইন জুয়ার দৌরাত্ম্য।
কয়েক ক্লিকে টাকা পাওয়ার আশায় এই জুয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেও শেষ পর্যন্ত সর্বস্ব হারাচ্ছেন অনেকে। কেউ ব্যবসার মূলধন হারিয়েছেন, কেউ চাকরি হারিয়ে ঋণের বোঝা বইছেন। আবার কেউ সহায়-সম্পদ বিক্রি করেও ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি। ফলে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি পরিবারেও দেখা দিচ্ছে অশান্তি। বাড়ছে দাম্পত্য কলহ ও বিচ্ছেদ। এমনকি ঋণের চাপ ও হতাশা থেকে আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অনলাইন জুয়ার মূল হোতাদের চিহ্নিত করে আটক ও বিচারের মুখোমুখি করা না হলে এই কারবার বন্ধ হবে না।
মেহেরপুর সরকারি মহিলা কলেজের উপাধ্যক্ষ মুহা. আব্দুল্লাহ আল আমিন ধূমকেতু বলেন, ‘মেহেরপুরকে মনে করা হয় অনলাইন জুয়ার স্বর্গরাজ্য। এর ফাঁদে পড়ে মারাত্মক সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে এসেছে।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মাঝেমধ্যে এজেন্টরা গ্রেফতার হলেও মূল হোতারা আটক হচ্ছেন না। গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যাওয়ার পর জামিনে বেরিয়ে অনেকে আবারও একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন। ফলে একদিকে মামলা ও গ্রেফতার চলছে, অন্যদিকে আড়ালে থেকে চক্রের কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশের তথ্য বলছে, ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত অনলাইন জুয়া-সংশ্লিষ্ট আইনে মেহেরপুরে পাঁচটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ৬৩ জনকে। চলতি বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত আটক হয়েছেন ১৫ জন।
মেহেরপুরের পুলিশ সুপার উজ্জ্বল কুমার দাস বলেন, অনলাইন জুয়া-সংশ্লিষ্ট ঘটনায় পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, এজেন্টদের গ্রেফতার করেই কি বন্ধ করা যাবে কোটি টাকার এই কারবার? নেপথ্যে থাকা মূল হোতারা কারা, কোথা থেকে পরিচালিত হচ্ছে এই নেটওয়ার্ক, অর্থের প্রবাহই বা যাচ্ছে কোথায়—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
মেহেরপুরবাসীর প্রত্যাশা, মাঠপর্যায়ের এজেন্ট নয়—অনলাইন জুয়ার এই মুনাফার সাম্রাজ্যের নেপথ্যে থাকা মূল হোতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে। তাহলেই হয়তো থামবে কয়েক ক্লিকে স্বপ্ন দেখিয়ে সর্বস্ব কেড়ে নেয়ার এই কারবার।