শরতের কাশফুল আর নীল আকাশের কোল ঘেঁষে বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা এখন উৎসবমুখর আবহে উদযাপিত হচ্ছে জয়পুরহাটে। ঢাকের বাদ্য, কাঁসা, শাঁখের ধ্বনি আর ধূপের সুবাসে মুখরিত হয়ে উঠেছে জেলার প্রতিটি মণ্ডপ। অশুভ শক্তির বিনাশ আর কল্যাণময়ী দেবী দুর্গার আবাহনে মেতে উঠেছে আবালবৃদ্ধবনিতা।
বর্ণিল আলোকসজ্জা ও দৃষ্টিনন্দন মণ্ডপ:
চলতি বছর জয়পুরহাট সদর সহ পাঁচবিবি, কালাই, ক্ষেতলাল ও আক্কেলপুর উপজেলার মণ্ডপগুলোতে লেগেছে উৎসবের ছোঁয়া। এবারও বিভিন্ন থিম ও বাহারি আলোকসজ্জায় সাজিয়ে তোলা হয়েছে মণ্ডপগুলো। কোনো কোনো মণ্ডপে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে প্রাচীন ঐতিহ্য, আবার কোথাও আধুনিক শৈল্পিকতার ছোঁয়ায় দেবীর রূপ করা হয়েছে মনোমুগ্ধকর। প্রতিমা দর্শন সন্ধ্যা নামতেই মণ্ডপগুলোতে ভিড় জমাচ্ছেন ঢল নামা দর্শনার্থীরা। শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নন, উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে সব ধর্মের মানুষের উপস্থিতি মণ্ডপগুলো রূপ দিয়েছে সম্প্রীতির মিলনমেলায়।
কেনাকাটার ধুম ও গ্রামীণ মেলা:
পূজাকে কেন্দ্র করে জয়পুরহাটের বিপণিবিতানগুলোতে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ছিল উপচে পড়া ভিড়। নতুন পোশাকে সেজে পরিবারের সবাইকে নিয়ে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরছেন দর্শনার্থীরা। এছাড়া বিভিন্ন মণ্ডপ সংলগ্ন এলাকায় বসেছে ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ মেলা। জিলাপি, পাঁপড় ভাজা, মাটির খেলনা আর মণ্ডা-মিঠাইয়ের পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা, যা উৎসবের আমেজ আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
কড়া নিরাপত্তা ও সম্প্রীতির বন্ধন:
জয়পুরহাটের পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তারা অত্যন্ত সন্তুষ্ট। উৎসব নির্বিঘ্ন করতে প্রতিটি মণ্ডপে মোতায়েন রয়েছে পুলিশ, আনসার ও ভিডিপি সদস্য। পাশাপাশি মণ্ডপ গুলোর নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক দল ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বসানো হয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা ও নিরাপত্তা চৌকি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, জয়পুরহাটের দীর্ঘদিনের ইতিহাস হলো ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে সব শ্রেণির মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে-জয়পুরহাট সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। দেবী দুর্গার বিদায়ের মধ্য দিয়ে এই উৎসবের সমাপ্তি ঘটলেও, মানুষের মনের এই সম্প্রীতির বন্ধন অটুট থাকবে বছরজুড়ে-এমনটাই প্রত্যাশা জেলাবাসীর।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ সূত্র আরও বলছেন, আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশে এবার জয়পুরহাট জেলার ৫টি উপজেলায় সর্বমোট ৩১০টি মন্দির ও মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। পূজা উদযাপন নির্বিঘ্ন করতে সরকারিভাবে ইতিমধ্যে প্রতিটি মন্দির ও মণ্ডপের জন্য ৬০০ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে পূজার আবহ জমজমাট হলেও প্রতিমা তৈরির প্রধান কারিগর মৃৎশিল্পীদের মনে রয়েছে কছুটা ক্ষোভ ও হতাশা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে রং ও উপকরণের দাম বাড়লেও সেই তুলনায় ন্যায্য মজুরি বা পারিশ্রমিক না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় ভাস্কর শিল্পীরা।
আগামীকাল শুক্রবার ১৬ অক্টোবর-২০২৬ মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে পাঁচ দিনব্যাপী দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা উল্লেখ করে মাদারগঞ্জ দুর্গা মন্দিরের পরিচালক বিবেকানন্দ চৌধুরী আশা প্রকাশ করে জানান,সব উদ্বেগ পেরিয়ে উৎসব উদযাপনে আশাবাদী আয়োজকেরা।প্রতিবছরের মতো এবারও জেলাজুড়ে অত্যন্ত শান্তিময় ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে পূজা উদযাপিত হবে। কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ছাড়াই সম্প্রীতির মেলবন্ধনে শারদোৎসব সম্পন্ন হবে-এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায় সহ সর্বস্তরের জেলাবাসীর। আর প্রতিটি ধর্মের মানুষ নজি নিজ ধর্ম যথাযথভাবে পালন করবেন,সকল ধর্মের মানুষের এমনটাই প্রত্যাশা হওয়া উচিৎ বলে মনে করেন জেলার সচেতন মহল।