একসময় গ্রামবাংলার হাটবাজার কিংবা জনপদে সাপের খেলা দেখিয়ে মানুষের মনোরঞ্জন করতেন সাপুড়েরা। নারীরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে সিংগা লাগানোসহ নানা ধরনের লোকজ চিকিৎসার কাজ করতেন। সময়ের পরিবর্তনে এসব পেশার কদর কমেছে, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রাও। তবে জীবিকার তাগিদে এখনও বংশপরম্পরায় সেই পেশা আঁকড়ে ধরে আছেন একদল মানুষ।
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার ঘাটিনা ব্রিজসংলগ্ন করতোয়া নদীর পাড়ে অস্থায়ী ঘর তুলে বসবাস করছেন প্রায় ৩০টি সাপুড়ে বেদে পরিবার। নদীর তীরে সারি সারি ঘর, কোথাও রান্নার আয়োজন, কোথাও শিশুদের খেলাধুলা—এভাবেই কাটছে তাঁদের প্রতিদিনের জীবন। স্থায়ী ঠিকানা ঢাকা সাভার জেলায় হলেও কাজের সন্ধানে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় ঘুরে বেড়ানোই তাঁদের জীবনের বাস্তবতা।
বেদে পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, একসময় তাঁদের বহরে ৫০ থেকে ৬০টি পরিবার একসঙ্গে বসবাস করত। সময়ের সঙ্গে অনেকে আলাদা হয়ে গেছেন। এখন প্রায় ৩০টি পরিবার মিলে করতোয়ার পাড়ে অস্থায়ীভাবে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁদের জীবনযাত্রায় নেই স্থায়ী বসতির নিশ্চয়তা, আছে প্রতিদিনের আয়-রোজগার নিয়ে অনিশ্চয়তা।
পুরুষদের আয়ের অন্যতম উৎস সাপের খেলা দেখানো। সাপের ঝাঁপি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে তাঁরা ছুটে যান বিভিন্ন গ্রাম, হাটবাজার ও জনবসতিতে। একসময় সাপের খেলা ছিল গ্রামীণ বিনোদনের পরিচিত অনুষঙ্গ। কিন্তু আধুনিক বিনোদনের বিস্তার এবং সময়ের পরিবর্তনে এ পেশায় আগের মতো আয় হচ্ছে না। ফলে সংসার চালাতে প্রতিনিয়ত নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাঁদের।
পরিবারের উপার্জনে পিছিয়ে নেই নারীরাও। তাঁরা দল বেঁধে গ্রামে গ্রামে ঘুরে সিংগা লাগানোসহ বিভিন্ন ধরনের লোকজ চিকিৎসার কাজ করেন। সকাল হলেই প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। দিন শেষে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে পরিবারের খাবার, সন্তানদের পড়াশোনা ও নিত্যদিনের খরচ।
এক বেদে নারী দৈনিক যমুনার কথাকে বলেন, আমরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে সিংগা লাগাই। দিনে যা আয়-রোজগার হয়, তা দিয়েই সংসার চালাই। তাঁর কথায়, প্রতিদিনের আয়ই পরিবারের ভরসা। কাজ না থাকলে সংসারের খরচ মেটানোও কঠিন হয়ে পড়ে।
এই বহরের শিশুদের শৈশবও কাটে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে। স্থায়ী বসতি না থাকায় তাদের নিয়মিত পড়াশোনা, চিকিৎসা ও নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে ওঠে।
জীবিকার প্রয়োজনে অভিভাবকদের সঙ্গে স্থান পরিবর্তন করতে হওয়ায় শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হয় অনিশ্চয়তা।
বেদে পরিবারের সদস্যদের কাছে এই জীবন নতুন কিছু নয়। বংশপরম্পরায় চলে আসা পেশা ও জীবনযাত্রার সঙ্গে তাঁরা অভ্যস্ত। তবে সময়ের পরিবর্তনে পুরোনো পেশার আয় কমে যাওয়া এবং স্থায়ী জীবিকার সুযোগের অভাব তাঁদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
করতোয়া নদীর পাড়ে তাঁদের এই অস্থায়ী বসতি শুধু ৩০টি পরিবারের আশ্রয় নয়; এটি গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা লোকজ পেশা ও সংস্কৃতিরও এক প্রতিচ্ছবি। ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা থাকলেও জীবিকার অনিশ্চয়তা, সন্তানদের শিক্ষা এবং স্থায়ী আবাসনের প্রশ্ন তাঁদের প্রতিদিনের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে।
আধুনিকতার স্রোতে বদলে যাচ্ছে গ্রামবাংলার চেনা অনেক দৃশ্য। তবু করতোয়ার পাড়ে সাপুড়ে বেদে পরিবারগুলোর জীবন মনে করিয়ে দেয়, ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি তাঁদের প্রয়োজন নিরাপদ আবাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বিকল্প জীবিকার সুযোগ।