মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে পারস্য উপসাগরে আরও তিনটি কার্গো জাহাজে হামলার খবরের পর আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও বেড়েছে অপরিশোধিত তেলের দাম। জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় বিশ্ববাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
বিবিসি তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বুধবার এশিয়ার বাজারে লেনদেন শুরুর পর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একপর্যায়ে ৯ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার অতিক্রম করে। পরে কিছুটা কমে তা প্রায় ৯৭ দশমিক ৫০ ডলারে নেমে আসে।
এর আগে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) ঘোষণা দেয়, যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানের চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ কমাতে তারা রেকর্ড পরিমাণ ৪০ কোটি ব্যারেল তেল মজুত থেকে বাজারে ছাড়বে। তবে এই ঘোষণার পরও বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতি থামেনি।
বিশ্ব জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ অবস্থায় রয়েছে। জাহাজে হামলার আশঙ্কায় অনেক শিপিং কোম্পানি এই রুট এড়িয়ে চলতে শুরু করেছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর এক মুখপাত্র হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল কিংবা তাদের মিত্রদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যেকোনো জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
তিনি বলেন, “কৃত্রিমভাবে তেলের দাম কমানো সম্ভব নয়। প্রস্তুত থাকুন—তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত যেতে পারে।”
এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে বিশ্ব শেয়ারবাজারেও। জাপানের নিক্কেই সূচক প্রায় ১ শতাংশ কমেছে, আর লন্ডনের এফটিএসই ১০০ সূচক লেনদেন শুরুর সময় ০ দশমিক ৬ শতাংশ নিচে নেমে যায়।
বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই রুটে কোনো বিঘ্ন ঘটলেই তার প্রভাব পড়ে পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আইইএর রেকর্ড পরিমাণ তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত তাৎপর্যপূর্ণ হলেও এটি কেবল সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। সিঙ্গাপুর ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গবেষক মার্টিন মা বলেন, সরবরাহ নিয়ে ঝুঁকি যতদিন থাকবে ততদিন তেলের দাম উচ্চ পর্যায়েই থাকবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বিমান হামলা শুরু করার পর থেকেই তেলের বাজার অত্যন্ত অস্থির হয়ে উঠেছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলার ছুঁয়ে যায়।
এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানির দাম বাড়তে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে মঙ্গলবার গড়ে প্রতি গ্যালন পেট্রলের দাম ৩ দশমিক ৫০ ডলারের ওপরে উঠেছে বলে জানিয়েছে আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন।
মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল এশিয়ার অনেক দেশেও পরিস্থিতি চাপের মুখে পড়েছে। ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের বিভিন্ন পেট্রল পাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে।
জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য থাইল্যান্ড সরকার অধিকাংশ সরকারি দপ্তরের কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে। অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর থেকেও কর্মকর্তাদের বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
এদিকে ফিলিপাইন সরকার জ্বালানি ব্যবহার কমাতে সরকারি খাতে চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে আরও বড় ধাক্কা লাগতে পারে।