দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার পূর্ব ডাঙাপাড়া পাঁচপীর ফাযিল মাদ্রাসায় চারটি পদে গোপনে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অবসরে যাওয়ার দিনে তা প্রকাশ করার অভিযোগ উঠেছে বিদায়ী অধ্যক্ষ আব্দুল আজিজের বিরুদ্ধে। এসব নিয়োগে প্রায় অর্ধকোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কাগজপত্রে গত বছরের ১২ ডিসেম্বর ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট (আইসিটি) পদে জহুরুল ইসলাম, অফিস সহকারী কাম হিসাব সহকারী পদে নুরনবী ইসলাম ও আয়া পদে আশিকা খাতুন এবং চলতি বছরের ২৭ মার্চ অফিস সহায়ক পদে ইব্রাহীম ইসলামের নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে। তবে বাস্তবে এসব নিয়োগের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির অধিকাংশ শিক্ষক-কর্মচারী, এমনকি নিয়োগ কমিটির সদস্যরাও অবগত ছিলেন না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চলতি মাসের ৪ মে অবসরে যান অধ্যক্ষ আব্দুল আজিজ। তাঁর বিদায়ী অনুষ্ঠানের শেষ মুহূর্তে ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট (আইসিটি), অফিস সহকারী কাম হিসাব সহকারী ও আয়া পদে নিয়োগ পাওয়া তিনজন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন। এসময় অধ্যক্ষ সবার সামনে তাদের পরিচয় করিয়ে দিলে শিক্ষক-কর্মচারীদের মাঝে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এর আগে কখনও ওই ব্যক্তিদের প্রতিষ্ঠানে দেখা যায়নি। এছাড়া সর্বশেষ নিয়োগ পাওয়া অফিস সহায়ক ইব্রাহীম এখনও প্রকাশ্যে প্রতিষ্ঠানে যোগদান করেননি বলেও জানা গেছে। তবে মাদ্রাসায় উপস্থিত না থাকলেও হাজিরা খাতায় তাদের স্বাক্ষর দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আসগর আলী, নিয়োগ কমিটির সদস্য সহযোগী অধ্যাপক ইব্রাহিম খলিলসহ একাধিক শিক্ষক-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে তারা দেখেননি। এমনকি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, পরীক্ষার তারিখ কিংবা নিয়োগ বোর্ড বসার বিষয়েও তারা অবগত নন। তাঁদের অভিযোগ, সম্পূর্ণ গোপনে নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারী অভিযোগ করেন, চারটি পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে প্রতি পদে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে।
ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট (আইসিটি) পদে জহুরুল ইসলাম ও অফিস সহকারী কাম হিসাব সহকারী পদে নিয়োগ পাওয়া নুরনবী ইসলাম বলেন, নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই তাঁরা নিয়োগ পেয়েছে। প্রতিষ্ঠান না এসেও হাজিরা খাতায় স্বাক্ষরের বিষয়ে জানতে চাইলে তাঁরা কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।
নিয়োগ কমিটির সদস্য সহযোগী অধ্যাপক ইব্রাহিম খলিল বলেন, “নিয়োগ পরীক্ষা সংক্রান্ত কোনো কার্যক্রমে আমি স্বশরীরে উপস্থিত ছিলাম না। তবে বিভিন্ন সময়ে বিদায়ী অধ্যক্ষ ফাঁকা কাগজে আমার স্বাক্ষর নিয়েছেন। তিনি প্রতিষ্ঠান প্রধান ও আমার মামা হওয়ায় বিষয়গুলো না বুঝেই স্বাক্ষর করেছি।

প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত প্রভাষক মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, “নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে বিদায়ী অধ্যক্ষ সঠিক তথ্য উপস্থাপন করেননি। এনটিআরসিএ নিয়োগসহ নানা বিষয়ে ভুল তথ্য দেখিয়ে তিনি আমার স্বাক্ষর নিয়েছেন। নিয়োগ প্রক্রিয়ার অনেক বিষয় তাঁর অবসরের পরে জানতে পেরেছি।”
বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আসগর আলী বলেন, “নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে আমি অবগত ছিলাম না। বিদায়ী অধ্যক্ষ তাঁর শেষ কর্মদিবসে সবার সামনে নিয়োগপ্রাপ্তদের পরিচয় করিয়ে দেন। পরে নিয়োগ সংক্রান্ত কাগজপত্র খুঁজেও পাওয়া যায়নি। অতি গোপনে নিয়োগ দেওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয়।”
অভিযুক্ত অধ্যক্ষ আব্দুল আজিজ বলেন, “সকল নিয়ম মেনেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে এবং নিয়োগপ্রাপ্তরা যোগদান করেছেন।” তবে নিয়োগ প্রক্রিয়া গোপন রাখার কারণ, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষা ও কাগজপত্র সংক্রান্ত প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি তিনি। আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, “নিয়োগ দিতে গিয়ে বরং আমার নিজেরই টাকা খরচ হয়েছে।”
এবিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কামরুজ্জামান সরকার বলেন, “নিয়োগে অনিয়ম বা কোনো অভিযোগ থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হবে।”