বর্তমান সময়ে সুস্থ থাকার সহজ সমাধান হিসেবে অনেকেই ভিটামিন ও সাপ্লিমেন্টের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। সামান্য ক্লান্তি, চুল পড়া বা শরীর ব্যথা হলেই অনেকে নিজে নিজেই সাপ্লিমেন্ট খাওয়া শুরু করেন। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করার প্রভাব নিয়ে চ্যানেল 24 অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেছেন ডায়েটিশিয়ান ইসরাত জাহান ডরিন। তিনি জানান, এই অভ্যাস যতটা সহজ মনে হয়, ততটাই ঝুঁকিপূর্ণ।
শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ঠিক রাখতে ভিটামিন ও খনিজের ভূমিকা অপরিসীম। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বা অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাসের কারণে এসব পুষ্টির ঘাটতি দেখা দিতে পারে। আর এই ঘাটতি পূরণে সাপ্লিমেন্ট কার্যকর হলেও, সঠিক নির্দেশনা ছাড়া গ্রহণ করলে তা শরীরের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে বলেন পুষ্টিবিদ ইসরাত জাহান।
‘ভিটামিন এ’-এর সাপ্লিমেন্ট নেয়া
দৃষ্টিশক্তি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভিটামিন এ গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই আছেন চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ভিটামিন এ খান। বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে পুষ্টিবিদ ইসরাত জাহান বলেন, ভিটামিন এ সুস্থ থাকতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এখন অনেকেই নিয়মিত ‘ভিটামিন এ’-এর সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করেন কোনও ধারণা ছাড়াই।
তিনি আরও বলেন, একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের জন্য দৈনিক প্রায় ৯০০ মাইক্রোগ্রাম এবং নারীদের জন্য ৭০০ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন এ যথেষ্ট। ডিম, দুধ, গাজর, কুমড়া, পালং শাকের মতো খাবার থেকেই সহজে এই ভিটামিন পাওয়া যায়। কিন্তু প্রয়োজন ছাড়াই দীর্ঘদিন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে বমিভাব, মাথাব্যথা এমনকি লিভারের ক্ষতিও হতে পারে যা অনেকেই জানেন না।

ভিটামিন ডি
এমন অনেকেই আছেন যারা নিয়মিত ভিটামিন ডি নেন। এমনকি করোনা মহামারীর সময় এই সাপ্লিমেন্টের ব্যবহার বেড়ে যায়। এভাবে এই ভিটামিন খাওয়ার প্রভাব কেমন হতে পারে জানতে চাইলে ইসরাত বলেন, ভিটামিন ডি-ও এখন সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত সাপ্লিমেন্টগুলোর একটি। হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, অনেকে সামান্য ব্যথা হলেই নিজে থেকেই ভিটামিন ডি খাওয়া শুরু করেন। অথচ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ঘাটতি নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
সাবধান করে দিয়ে পুষ্টিবিদ বলেন, অতিরিক্ত ভিটামিন ডি শরীরে ক্যালসিয়াম জমা করে হাইপারক্যালসেমিয়ার মতো জটিলতা তৈরি করতে পারে, যা হৃদরোগ ও কিডনি সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়।
আয়রন
সাপ্লিমেন্টের কথা বলতে গেলে আয়রনকে বাদ দেয়া যাবে না। আয়রন বা লৌহও একটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, যা রক্তশূন্যতা প্রতিরোধে কাজ করে। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের জন্য দৈনিক ৮ মিলিগ্রাম এবং নারীদের জন্য ১৮ মিলিগ্রাম আয়রন প্রয়োজন, আর গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে এই চাহিদা ২৭ মিলিগ্রাম পর্যন্ত হয়। পুষ্টিবিদ ইসরাত সাবধান করে বলেন, আয়রন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলেও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে তা শরীরে জমে গিয়ে লিভারসহ অন্যান্য অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে, কারণ অতিরিক্ত আয়রন সহজে শরীর থেকে বের হয় না।
কোলাজেনের সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের বিষয়ে পুষ্টিবিদ বলেন, এটির প্রয়োজনীয়তা সবার জন্য এক নয়। ছবি: সংগৃহীত
কোলাজেন সাপ্লিমেন্ট
কোলাজেন সাপ্লিমেন্ট মূলত ত্বককে টানটান ও তারুণ্যদীপ্ত রাখতে সাহায্য করার কারণে জনপ্রিয় হয়েছে। এটি চুল ও নখের শক্তি বাড়াতে সহায়ক বলে অনেকেই নিয়মিত ব্যবহার করেন। বয়সজনিত বলিরেখা ও ত্বকের শুষ্কতা কমানোর সম্ভাব্য উপকারিতার জন্য এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। কোলাজেনের সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের বিষয়ে জানতে চাইলে পুষ্টিবিদ ইসরাত বলেন, এটির প্রয়োজনীয়তা সবার জন্য এক নয়। অনেক ক্ষেত্রেই সুষম খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে শরীর নিজেই পর্যাপ্ত কোলাজেন তৈরি করতে সক্ষম। তাই চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ ছাড়া কোলাজেন সাপ্লিমেন্ট নেয়া একেবারেই উচিত নয়।
পুষ্টিবিদ ইসরাত জাহান ডরিন বলেন, সাপ্লিমেন্ট কখনোই নিজে থেকে শুরু করা উচিত নয়। ছবি: সংগৃহীত
সাপ্লিমেন্ট নেয়া মানেই কি সুস্থতা
এমন অনেকেই আছেন যাদের ধারণা সাপ্লিমেন্ট নিলেই তারা সুস্থ থাকবে। তাই তারা অতিরিক্ত সাপ্লিমেন্ট নেন। এভাবে সাপ্লিমেন্ট নেয়ার প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন করলে পুষ্টিবিদ ইসরাত জাহান ডরিন বলেন, সাপ্লিমেন্ট কখনোই নিজে থেকে শুরু করা উচিত নয়। প্রথমে খাদ্যাভ্যাস মূল্যায়ন, প্রয়োজন হলে ল্যাব টেস্ট এবং এরপর বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ। মনে রাখতে হবে, “বেশি নিলেই বেশি উপকার” এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। বরং সঠিক মাত্রা, সঠিক সময় এবং সঠিক কারণেই সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত। সুস্থ থাকতে হলে প্রাকৃতিক খাবারের ওপর জোর দিন। বৈচিত্র্যময় ও সুষম খাদ্যই শরীরের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর পুষ্টির উৎস।
সাপ্লিমেন্ট আমাদের শরীরের জন্য সহায়ক হতে পারে, কিন্তু তা কখনোই “নিজে নিজে” নেয়ার মতো বিষয় নয়। সচেতনতা আর সঠিক জ্ঞানই পারে আপনাকে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি থেকে দূরে রাখতে। তাই সুস্থ থাকতে চাইলে আগে খাবারে নজর দিন, তারপর প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।