মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালী কার্যত অবরোধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবারও বেড়েছে। সোমবার (২৭ এপিল) আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড স্থানীয় সময় সকাল ৯:৫৪ মিনিটে (জিএমটি ০৬:৫৪) ব্যারেল প্রতি ১০১.৩৪ ডলারে লেনদেন হয়েছে, যা আগের দিনের ৯৯.১৩ ডলারের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ২ শতাংশ বেশি।
এছাড়া মার্কিন বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট প্রায় ১ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ব্যারেল প্রতি ৯৬ দশমিক ১৯ ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের সেশনে ছিল ৯৪ দশমিক ৪০ ডলার। গত সপ্তাহে ব্রেন্ট এবং ডব্লিউটিআই যথাক্রমে প্রায় ১৭ শতাংশ এবং ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল, যা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সর্বোচ্চ সাপ্তাহিক বৃদ্ধি।
স্থানীয় সময় রবিবার (২৬ এপ্রিল) রাশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাক বলেছেন, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া হলেও, তেলের বাজারকে তার আগের অবস্থায় ফিরতে বেশ কয়েক মাস সময় লেগে যেতে পারে।
রাশিয়ার ভিজিটিআরকে সম্প্রচার সংস্থাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নোভাক বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সম্পদের ব্যাপক ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যা স্বল্প সময়ের মধ্যে কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে না।
তিনি আরও বলেন,সংকটটি খুবই গভীর। এই সময়ে বিপুল পরিমাণ ব্যারেল তেল বাজারে পৌঁছায়নি এবং হরমুজ প্রণালীতে প্রচুর জাহাজ আটকে পড়েছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই, ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে এবং আগের পর্যায়ে ফিরে আসতে কিছুটা সময় লাগবে। আমাদের মতে, এতে বেশ কয়েক মাস সময় লাগবে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ায় স্বল্প মেয়াদে তেলের দাম উঁচুতে থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। কারণ ব্যবসায়ীরা ক্রমাগত সরবরাহ সংকট, মজুত পূরণে ধীরগতি এবং বাজারের ভারসাম্য পুনরুদ্ধারের গতি নিয়ে অনিশ্চয়তাকে বিবেচনায় রাখছেন, যা তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
উল্লেখ্য, ২৮ ফেব্রুয়ারির যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের পর থেকে তেহরান হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে, যা মূলত এশিয়াজুড়ে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে আঘাত হেনেছে। বর্তমানে যুদ্ধবিরত কার্যকর থাকলেও, সংঘাতের স্থায়ী অবসানের জন্য প্রচেষ্টা চলছে। অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া এবং যুদ্ধের অবসান ঘটানোর জন্য ইরানের প্রস্তাব সরবরাহ সংক্রান্ত উদ্বেগ কমিয়ে দামের আরও বৃদ্ধিকে সীমিত করতে সাহায্য করেছে।
অ্যাক্সিওস নিউজ সাইটের তথ্যমতে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কূটনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে পাকিস্তানসহ মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে প্রস্তাবটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সংবাদমাধ্যমটির বরাত দিয়ে সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে মতবিরোধ এড়িয়ে অবরোধ তুলে নেওয়া এবং সামুদ্রিক যান চলাচল পুনরুদ্ধারের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে একটি দ্রুত চুক্তি করা।
এই প্রস্তাবের অধীনে যুদ্ধবিরতি দীর্ঘ সময়ের জন্য বাড়ানো বা স্থায়ী করা হবে এবং প্রণালীটি পুনরায় খুলে দেওয়া ও নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পরেই কেবল পারমাণবিক আলোচনা শুরু হবে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা এবং আলোচনা সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো জানিয়েছে, হোয়াইট হাউস প্রস্তাবটি পেয়েছে কিন্তু এটি নিয়ে অগ্রসর হবে কিনা তা জানায়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অচলাবস্থা এবং সম্ভাব্য পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করতে সোমবার (২৭ এপ্রিল) জ্যেষ্ঠ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।
ট্রাম্প বলেছেন, তেহরানের ওপর চাপ বাড়াতে তিনি ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ বজায় রাখতেই পছন্দ করেন। তিনি বলেন, যখন আপনার কাছে বিপুল পরিমাণ তেল থাকে। যদি হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়া হয় তাহলে সেই লাইনটি ভেতর থেকে বিস্ফোরিত হবে। অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে পড়ার আগে ইরানের হাতে হয়তো মাত্র প্রায় তিন দিন সময় আছে বলেও জানান ট্রাম্প।
পারমাণবিক আলোচনা স্থগিত করার সিদ্ধান্তটি যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, কারণ ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখার ব্যাপারে ট্রাম্প একটি দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখেছেন।
সূত্র: ফক্স নিউজ।