সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ‘রাজ-রাজেশ্বরী মন্দির’ আজও টিকে আছে কেবল অস্তিত্বের লড়াইয়ে। প্রায় ছয়শ বছরেরও প্রাচীন দ্বিতল এই স্থাপনাটি সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও, দীর্ঘদিনের অবহেলা আর সংস্কারের অভাবে প্রতিনিয়ত ধাবিত হচ্ছে ধ্বংসের দিকে। একসময় যে স্থাপনাটি ছিল ইতিহাস, স্থাপত্যশৈলী ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের অনন্য নিদর্শন, বর্তমানে তা পরিণত হয়েছে ভগ্নপ্রায় ধ্বংসস্তুপে।
জানা যায়, উপজেলার খাজাঞ্চি ইউনিয়নের চন্দ্রগ্রাামে অবস্থিত টেরাকোটা নির্মাণশৈলীর এই মন্দিরটি জৈন্তা রাজ্যের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্যমতে, জৈন্তা রাজ্যের সেনাপতি বিজয় মানিক সেনাপতি এটি প্রতিষ্ঠা করেন। নির্মাণকাজে ব্যবহার করা হয়েছিল চিটাগুড়, চুন-সুরকি ও পোড়ামাটি। নির্মাণশৈলীতে জৈন্তা রাজবাড়ির স্থাপত্যের সঙ্গে এর বেশ কিছু মিলও লক্ষ করা যায়। তখনকার সময়ে এটি হিন্দু সম্প্রদায়ের তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, পুরো স্থাপনাজুড়ে যেন ধ্বংসের নির্মম চিহ্ন। কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে মূল দোতলা ভবনটি। উপরে ওঠার সিঁড়ি ভেঙে পড়েছে সম্পূর্ণ। দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় ফাটল। খসে পড়ছে প্লাস্টার, আলগা হয়ে গেছে প্রাচীন ইটের গাঁথুনি। টেরাকোটার কারুকাজের বেশির ভাগ অংশই নষ্ট হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। ভবনের ছাদ, দেয়াল ও কার্নিশজুড়ে জন্মেছে বড় বড় গাছ। লতাগুল্মে ঢেকে গেছে পুরো মন্দির। চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ভাঙা ইট, স্থাপত্যের খন্ডাংশ ও ধ্বংসাবশেষ। ভেতরের কক্ষগুলো স্যাঁতসেঁতে, কাদায় ভরা এবং সেখানে বাসা বেঁধেছে চামচিকা ও বিভিন্ন প্রজাতির সরীসৃপ।
স্থানীয় প্রবীণ বিজেন্দু সেনাপতি নারায়ণ বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে এই মন্দিরের গৌরবের কথা শুনে বড় হয়েছি। কিন্তু বছরের পর বছর কেটে গেলেও এটি রক্ষায় কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। এভাবে চলতে থাকলে একদিন হয়তো মন্দিরটির কোনো অস্তিত্বই থাকবে না।
গ্রামের বাসিন্দা প্রতাত সেনাপতি বলেন, আমার বড় মা যখন নববধূ হয়ে ও বাড়িতে আসেন, তখন মন্দিরটি অনেকটা নতুনের মতোই ছিলো। উনি খোদাই করা দেখেছেন ‘রাজ-রাজেশ্বরী মন্দির’ নামটা। আমরা তাদের কাছ থেকে শুনেছি, সে সময় নগর কীর্তন শেষে এ মন্দিরের ছাদ থেকেই লুট বিলানো হতো। বর্তমানে সংস্কারের অভাবে এটি জরাজীর্ণ-পরিত্যাক্ত হয়ে আছে।
এ বিষয়ে কথা হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাহিদ বিন কাশেম ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’কে বলেন, ‘মন্দিরটি বিশ্বনাথ উপজেলার জন্য ঐহিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। এটি রক্ষায় ২০২১ সালে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রত্নতত্ত্ব অধিপ্তরে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা কথা বলবো। তারা যাতে তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কারের উদ্যোগ নেন।